ঢাকা-১৬
১১ প্রার্থীর ৯ জনই ‘মাঠে নেই’, দুই প্রার্থীর দিকে তাকিয়ে এলাকাবাসী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর ১১ দিন। এসময় প্রার্থীদের দম ফেলার ফুরসত থাকার কথা নয়। তবে ঢাকা-১৬ আসনে ১১ প্রার্থীর ৯ জনই এখনো মাঠে অনেকটা নিষ্ক্রিয়। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শুধু বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। মাদক, ফুটপাত দখল, কিশোরগ্যাংসহ অনেক সমস্যার এ আসনের বাসিন্দারা চান সমাধান।
চূড়ান্ত প্রার্থী ১১ জন
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাতটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসন থেকে পাঁচবার আওয়ামী লীগ, দুবার বিএনপি জিতেছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। স্থানীয়রা বলছেন, এবার ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল হবে। প্রচারে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী- দুজনই সমানতালে লড়ছেন।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক ফুটবলার আমিনুল হক। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন জনসংযোগ। পিছিয়ে নেই কর্নেল (অব.) মো. আবদুল বাতেন, যিনি শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। জামায়াতের মজলিশে শুরার এ সদস্যও যাচ্ছেন প্রার্থীদের দুয়ারে দুয়ারে। সংসদীয় আসনটিতে দুই প্রার্থীর জনসংযোগ, পোস্টার, ব্যানার ছাড়া অন্য কারও প্রচার চোখে পড়েনি।

অন্য প্রার্থীরা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. সুলতান আহম্মেদ সেলিম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মাদ তৌহিদুজ্জামান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মো. রাশিদুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির-বিজেপি মো. নাজমুল হক, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. তারিকূল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির একেএম মোয়াজ্জেম হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) মো. মামুন হোসেন ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মো. আব্দুল কাদের জিলানী।
ফুটপাত দখল, মাদকে জর্জরিত আসনটি
ভোটাররা বলছেন- গ্যাস সংকট, মাদক, মশা, কিশোরগ্যাং ও ফুটপাত দখল এ আসনের বড় সমস্যা। প্রার্থীদের এসব সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে হবে। আসনটি ঘুরে দেখা যায় ডিওএইচএস, বর্ধিত পল্লবী ছাড়া প্রায় সব সড়ক ও ফুটপাত ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দখলে। এছাড়া পল্লবী এ, বি, সি, ডি, ত ও থ ব্লকের বিভিন্ন সড়কে ভ্রাম্যমাণ ভ্যান বসতে দেখা যায়। ফলে পথচারীদের ভোগান্তি হচ্ছে। দুই নম্বর ওয়ার্ডের হোপ মার্কেট, ১১ নম্বর বাজার সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বেচাকেনা করতে দেখা যায়।
আরও পড়ুন
সুপরিকল্পিত পুরান ঢাকা গড়তে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ চান ভোটাররা
জামায়াত আমিরের আসনে ৪৯ শতাংশই নারী ভোটার, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
‘কড়াইল বস্তির ভোট যার, সংসদ সদস্য পদ তার’
মিরপুর-১২ নম্বরের বাসিন্দা হাসানুল হক বলেন, বাসার নিচে ফুটপাত ও রাস্তা পুরোটাই দখল। পুরো এলাকায় ভ্রাম্যমাণ বাজার বসে। বাজারের ফলে রাস্তায় যানজট ও দুর্গন্ধ লেগে থাকে।
বর্ধিত পল্লবীর বাসিন্দা নাজমুন নাহার বলেন, মাদক, ইভটিজিংয়ের সমস্যাও আছে। গ্যাসের সমস্যা অনেক এখানে। সকালে-রাতে গ্যাস থাকে না। এখানে যারা উন্নয়ন করবে, দেশের জন্য অবদান রাখবে এ ধরনের নেতৃত্ব চাই আমরা।

১১ নম্বর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান বলেন, মাদক, চুরি, মশা, গ্যাস, জলাবদ্ধতাসহ নানান সমস্যা আছে এ আসনে। আগের সংসদ সদস্য এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। তবে এমপি যদি মন্ত্রী পদমর্যাদার কেউ হন তাহলে দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে।
চায়ের দোকান ও বিভিন্ন আলোচনা উঠে আসছে এখনকার ভোটাররা আর মার্কা দেখে নয়, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম ও প্রার্থীর সামর্থ্য দেখে ভোট দিতে চান। কালশী, মিরপুর ১১, কুর্মিটোলায় রয়েছে বিহারি ক্যাম্প। তারাও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ এলাকার বাসিন্দারা চান এমন নেতা যারা তাদের সুখে-দুঃখে থাকবে।
পল্লবী, কালশী, বাউনিয়াবাধ, মিরপুর ১১ ও বর্ধিত পল্লবী, ডিওএইচএস ঘুরে দেখা গেছে প্রার্থীদের ব্যানার। তবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের ব্যানার বেশি, একই অবস্থা প্রচার বুথের। পল্লবী ২ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার, কালশী বাসস্ট্যান্ডসহ কয়েকটি জায়গায় বিএনপি-জামায়াত বাদে অন্য প্রার্থীদের ব্যানার দেখা গেছে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে লেবার পার্টির এম মোয়াজ্জেম হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সাইফুল ইসলামের মাইকিং শুনেছেন তারা। বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা উঠান বৈঠক, জনসংযোগ, লিফলেট বিতরণসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকছেন।

পলাশ নগরের বাসিন্দা হাসনাইন যুবায়ের। তার সঙ্গে কথা হয় মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে। তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া কাউকে চিনি না। এই দুই দলের বাইরে অন্য কারও সমর্থকরাও তার কাছে আসেননি।
পল্লবী এ ব্লকে কথা হয় মাদরাসা শিক্ষার্থী যুবায়েরের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের দুজন প্রার্থী আছে। প্রচারে তারা পিছিয়ে। তবে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে কয়েকটি মিছিল দেখেছি।
প্রচারে পিছিয়ে থাকা প্রার্থীরা যা বলছেন
প্রচারে পিছিয়ে কেন জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) প্রার্থী মো. মামুন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, প্রচারে পিছিয়ে নেই। লিফলেট বিতরণ করছি। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছি। বড় শোডাউন করছি না, প্রার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছি। দুর্নীতি, চাদাঁবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ভোটারদের। পাশাপাশি বলছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর ভর্তি ফি নেওয়া হয়। এটা একধরনের নীরব চাদাঁবাজি।’
ভোটাররা কী চাইছেন তাদের অভিযোগ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে তারা ভালো আছেন। তাদের কোনো অভিযোগ নেই।
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) প্রার্থী মো. আব্দুল কাদের জিলানী জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রচার টুকটাক চলছে। দু-তিনদিনের মধ্যে মাঠে নামবো। কখন কী অবস্থা হয় সে জন্য মাঠে নামছি না। মানুষের সমস্যা বুঝতে চাইছি। শিগগির ইশতেহার ঘোষণা করবে আমাদের দল। এরপর প্রচারে নামবো। বড় সমাবেশ করবো।’
কীসের আশঙ্কা করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদৌ নির্বাচন হবে কি না…।’
জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীর বক্তব্য
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাতেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার নির্বাচনি আসন পল্লবী-রূপনগর এলাকায় বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধান করবো। এখানে ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ উন্নত মানের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে মানুষ চরম ভোগান্তিতে জীবনযাপন করছে। এছাড়া আটকে পড়া বিহারীদের জন্য নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করবো।’

বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক বলেন, ‘অলিগলিতে পাকা রাস্তা করার ব্যবস্থা করবো। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করছি। নির্বাচিত হলে ঢাকা-১৬ আসনকে মাদকমুক্ত করবো।’
ভোটের তথ্য
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-১৬ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩২১ জন। আসনটি ঢাকার উত্তরের সীমান্তবর্তী মিরপুরের পল্লবী ও রূপনগর থানা নিয়ে গঠিত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড এ আসনের অন্তর্ভুক্ত। একসময় বৃহত্তর মিরপুরের এ আসনটি ছিল ঢাকা-১১-র অধীনে। পরে ভেঙে তিনটি আসন করা হয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে (অবিভক্ত) বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত হারুনুর রশীদ মোল্লাহ্। এরপর আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন তারই মেজ ছেলে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্। এছাড়া ২০১৮ ও ২০২৪ সালেও জয়ী হন ইলিয়াস মোল্লাহ। মাঝে ১৯৯৬ সালে কামাল আহমেদ মজুমদার আওয়ামী লীগ থেকে আর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির এস এ খালেক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এসএম/এএসএ