নির্বাচনি প্রচারণায় বাসের ব্যবহার কীভাবে শুরু হলো?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো নির্বাচনি প্রচারণায় বাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও। স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও রাজপথের রাজনীতিতে প্রচারণা বা ‘ক্যাম্পেইন বাস’ এক জনপ্রিয় কৌশল। বিশালাকার একটি বাস যখন দলীয় স্লোগান আর প্রার্থীর ছবি নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে চলে, তখন তা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে একেকটি ভ্রাম্যমাণ মঞ্চ। নির্বাচনি প্রচারণায় বাসের এই রাজকীয় যাত্রা ও বৈশ্বিক বিবর্তন নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।
প্রথম ব্যবহার
নির্বাচনি প্রচারণায় বাসের ব্যবহার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৪৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী টমাস ই. ডিউই প্রথমবারের মতো একটি বাসকে তার প্রচারণার প্রধান অনুষঙ্গ করেন। তৎকালীন সময়ে ট্রেন বা প্লেনের চেয়েও ভোটারদের ব্যক্তিগত স্তরে স্পর্শ করতে এই বাস কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। যদিও সেই নির্বাচনে তিনি হ্যারি এস ট্রুম্যানের কাছে পরাজিত হন, কিন্তু নির্বাচনি ইতিহাসের পাতায় এক নতুন প্রচার-রীতির সূচনা করে যান।

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা বাস/ ছবি: পিএ পোস্ট
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার নির্বাচনি প্রচারণার জন্য বাসকে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ২০১৬ এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে গ্রামীণ আমেরিকা ও শিল্পাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে পৌঁছাতে তিনি এবং তার প্রচারণা দল বিশালাকার বিলাসবহুল বাস ব্যবহার করেন। ট্রাম্পের নাম ও স্লোগান সম্বলিত এই বাসগুলো ভোটারদের মধ্যে ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক চলন্ত বিলবোর্ড হিসেবে কাজ করেছিল। বিশেষ করে সুইং রাজ্যগুলোতে ট্রাম্পের প্রচারণা বাসের বহর ভোটারদের নজর কাড়তে ব্যাপক সফল হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘ব্যাটল বাস’
যুক্তরাষ্ট্রের পর এই ধারায় সবচেয়ে বেশি নাম কুড়িয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে এই যানগুলো ‘ব্যাটল বাস’ নামে পরিচিত। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে প্রচারণা বাসের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে ডেভিড ওয়েন এবং ডেভিড স্টিল তাদের বিখ্যাত হলুদ রঙের বাসে চড়ে পুরো দেশ মাতিয়েছিলেন। পরবর্তীতে টনি ব্লেয়ার থেকে শুরু করে বরিস জনসন পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী প্রচারণার স্বার্থে বাসের ওপর ভরসা রেখেছেন।
তুরস্কের ‘নির্বাচনি ক্যারাভান’
তুরস্কের আধুনিক রাজনীতিতে বাসের ব্যবহারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। তার দল একে পার্টি তুরস্কের প্রতিটি নির্বাচনে কয়েক ডজন বিশালাকার বাস ব্যবহার করে, যা দেশজুড়ে ‘নির্বাচনি ক্যারাভান’ নামে পরিচিত।
এরদোয়ানের নির্বাচনী প্রচারণা বাস/ ছবি: এক্স
এরদোয়ানের প্রচারণা বাসগুলো অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম এবং বড় এলইডি স্ক্রিন সমৃদ্ধ, যার মাধ্যমে তার ভাষণ ও দলীয় সঙ্গীত প্রচার করা হয়। অনেক সময় তিনি নিজেই বাসের ভেতরে বসে দূরপাল্লার সফর করেন এবং বাসের বিশেষ ছাদ বা গ্যালারি থেকে জনতার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তুরস্কের রাস্তায় এরদোয়ানের ছবি সম্বলিত এই বাসগুলো তার রাজনৈতিক শক্তির এক দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তান: কন্টেইনার ও বাসের সংমিশ্রণ
পাকিস্তানের রাজনীতিতে বাসের ব্যবহার ভিন্ন মাত্রা পায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার দল পিটিআই-এর মাধ্যমে। তিনি কেবল প্রচারণার জন্য নয়, বরং সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘আজাদি মার্চ’-এ বাস ও কন্টেইনারকে ভ্রাম্যমাণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিলেন। এছাড়া নওয়াজ শরীফ এবং বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকেও বড় বড় কনভয়ে সুসজ্জিত বাসে চড়ে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
ভারত: ‘রথযাত্রা’ ও বিলাসবহুল বাসের সংস্কৃতি
ভারতে নির্বাচনি প্রচারণায় বাস এখন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে প্রায়ই একে ‘রথ’ হিসেবে প্রচার করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি ‘সোমনাথ থেকে অযোধ্যা’ রথযাত্রার মাধ্যমে বাসে চড়ে দেশব্যাপী যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, তা ভারতের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বিজেপির প্রচারণা বাস/ ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাস সাজান। কারও কারও বাসে হাইড্রোলিক লিফট থাকে, যা দিয়ে প্রার্থী বাসের ছাদে উঠে সরাসরি জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে পারেন। পাশাপাশি থাকে এসি, কনফারেন্স রুম এবং স্যাটেলাইট সংযোগ সমৃদ্ধ আধুনিক প্রযুক্তির সমাহার।
বাংলাদেশ: বাসে প্রচারণার নতুন রূপ
বাংলাদেশেও ইদানিং নির্বাচনি প্রচারণায় বাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে। আগে কেবল ট্রাক বা খোলা জিপ ব্যবহার করা হলেও এখন রাজনৈতিক দলগুলো আধুনিক বাসের দিকে ঝুঁকছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুসজ্জিত বুলেটপ্রুফ বাসে দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও একটি অত্যাধুনিক মাল্টিমিডিয়া বাস উদ্বোধন করেছেন। এটি উভয় দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।
কেন জনপ্রিয় এই প্রচারণা বাস?
- ভ্রাম্যমাণ কার্যালয়: এই বাসগুলো প্রার্থীর অস্থায়ী অফিস ও বিশ্রামাগার হিসেবে কাজ করে।
- নিরাপত্তা: রাস্তার উন্মুক্ত মঞ্চের চেয়ে বাস অনেক বেশি নিরাপদ এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
- তৃণমূল সংযোগ: দুর্গম এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই বড় গাড়ির বহর নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যা প্রার্থীর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের কাছে আরও দৃঢ় করে তোলে।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া এই ‘বাস সংস্কৃতি’ বর্তমান প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আরও বর্ণিল হয়েছে। ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর এই চাকা আগামী দিনগুলোতে আরও আধুনিক রূপ নেবে বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া
কেএএ/