শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাফিকুর রহমানকে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার স্ত্রী ও দুই গৃহকর্মীর বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাফিকুর রহমানকে পাঁচ দিন, তার স্ত্রী বিথিকে সাত দিন, একই বাসার গৃহকর্মী রূপালী খাতুনকে পাঁচ দিন এবং সুফিয়া বেগমকে ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক রোবেল মিয়া চার আসামিকে সাত দিন করে রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন। গত রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে শুনানির জন্য আজ মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করেন।
আজ মঙ্গলবার বিকেল পৌনে তিনটার দিকে চার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিকেল তিনটা ১৩ মিনিটে বিচারক এজলাসে বসে রিমান্ড শুনানি শুরু করেন। শুনানিতে আসামিপক্ষ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। অপরদিকে ভুক্তভোগী পক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। সব পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে আসামিরা পরস্পরের সহযোগিতায় শিশুটির ওপর নির্যাতন চালাতেন। নির্যাতনের ঘটনায় ব্যবহৃত গরম খুন্তি কোথায় রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কিত তথ্য তাদের জানা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিশুটির শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্ন দেখে আরও গুরুতর নির্যাতনের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, সম্ভাব্য অন্যান্য জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং নির্যাতনের সরঞ্জাম উদ্ধারের জন্য রিমান্ড প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন‘শিশুটিকে গরম খুন্তির সেঁকা দেওয়া হতো’, স্ত্রীসহ বিমানের এমডি কারাগারে শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতন, স্ত্রীসহ বিমানের এমডি গ্রেফতার
এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের একটি বাসা থেকে চার আসামিকে গ্রেফতার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পরে এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। অপর দুই আসামি হলেন ওই বাসার গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও মোছা. সুফিয়া বেগম। ঘটনার পর সরকার সাফিকুর রহমানকে বিমানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়।
মামলার বাদী শিশুটির বাবা পেশায় একজন হোটেল কর্মচারী। মামলার বিবরণে তিনি জানান, সাফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর জানতে পারেন, তার একটি ছোট মেয়ে রয়েছে এবং ওই বাসায় শিশু দেখাশোনার জন্য একজন গৃহকর্মী খোঁজা হচ্ছে। পরে বাদী ওই বাসায় গিয়ে সাফিকুর ও বিথির সঙ্গে দেখা করেন। তারা শিশুটির বিয়েসহ ভবিষ্যতের খরচ বহনের আশ্বাস দেন। এতে সম্মতি দিয়ে গত বছরের জুন মাসে তিনি তার মেয়েকে ওই বাসায় কাজে দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত বছরের ২ নভেম্বর বাদী শেষবারের মতো মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন। এরপর একাধিকবার দেখা করতে চাইলেও বিভিন্ন অজুহাতে পরিবারটি তা হতে দেয়নি। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি দুপুর দেড়টার দিকে বিথি ফোন করে জানান, শিশুটি অসুস্থ এবং তাকে নিয়ে যেতে বলেন। বাদী দুপুর দুইটার দিকে সেখানে গেলে বিথি বাইরে আছেন জানিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাড়ির বাইরে তার কাছে শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয়।
সে সময় বাদী দেখতে পান, মেয়েটির দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিল না। বিষয়টি জানতে চাইলে বিথি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এরপর বাদী শিশুটিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
শিশুটি পরে তার বাবাকে জানায়, গত ২ নভেম্বরের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সাফিকুর রহমান, বিথিসহ অন্যরা তাকে মারধর করতেন এবং গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দিতেন। এসব নির্যাতনের ফলে সে গুরুতর আহত হয়।
পরে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে বাদী ১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর ৫ ফেব্রুয়ারি সরকার সাফিকুর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে।
এমডিএএ/কেএসআর