নির্বাচনি প্রচারণার শেষ সময় এখন।প্রার্থীদের আহার-নিদ্রা নাই হয়ে যায় এই সময়।সবার লক্ষ্য থাকে ভোটারদের মন জয় করার।বিশেষ করে সুইং ভোটারদের প্রতি সবার দৃষ্টি থাকে প্রচারণার এই সময়টাতে।দোদল্যমান ভোটাররাও যাচাইবাছাই করতে শুরু করে।তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নিজের সমর্থন কাকে দেওয়া যায় সেই ব্যাপারে।কিন্তু এবছর একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব বেড়ে গেছে তাদের।রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং তাদের রাজনৈতিক চরিত্র দেখে বিভ্রমে পড়েছে তারা।বলতে গেলে সুইং ভোটাররা এমন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি এর আগে কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না।রাজনৈতিক দলগুলোও হলফ করে বলতে পারছে না ভোটের গতিমতি।
সবসময়ই সুইং ভোটারদের ওপর পাস ফেইল নির্ভর করে অনেকাংশে।সম্ভবত এবছর বাংলাদেশের ইতিহাসে সুইং ভোটার সবচেয়ে বেশি। জোর দিয়েই বলা যায় তারাই এবারের ভাগ্য নির্ধারকও। সাধারণত সুইং ভোটার ৪০ শতাংশ থেকে সামান্য কিছু বেশি হয়।এই সংখ্যা ভোট ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে।এবারও কমবে তবে,সুইং ভোটারদের একটি অংশ ভোটদানেও বিরত থাকবে। কারণ এবার সুইং ভোটারদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট।বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোট মোটামুটি ৩৫-৪০ শতাংশ হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগের পতনের পর আওয়ামী ভোটার যদি ২০ শতাংশেও নেমে আসে তখন এই সুইং ভোটারের হার ৬০ শতাংশের বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। আওয়ামী লীগের এই ভোটাররা দুদিন আগেও অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তারা কাকে ভোট দেবে।
এই সুইং ভোটারদের সামনে অন্য সময়ের চেয়ে জটিলতর প্রশ্ন।প্রথম কথা হচ্ছে, তাদের দলের অনুপস্থিতি।তারা তাদের পছন্দের দলের অনুপস্থিতিতে তারা কি ভোট কেন্দ্রে যাবে? যদি যায় তাহলে তারা কাকে ভোট দেবে? এদের সঙ্গে সাধারণ সুইং ভোটার যুক্ত হচ্ছে।তার মানে প্রার্থী ও দলগুলোকে বাংলাদেশের অধিকাংশ ভোটারের কাছে জবাব দিতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ভোটারদের প্রধান প্রতিপক্ষ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে খ্যাত জামায়াতে ইসলামী।অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ বিরোধী হিসেবে কিছু ইসলামপন্থী দলও তাদের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী।সাদামাটা কথায় এই দুটি পক্ষ আওয়ামী লীগের ভোট না পাওয়ারই কথা।কিন্তু পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্নতর দেখা যাচ্ছে।এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি কৌশলে পরিবর্তন আনার কারণে তারা কিছু আওয়ামী লীগের ভোটও বাগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।বিশেষ করে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর পরই তারা সেই কৌশল অবলম্বন করে।
আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা শুরু হয় তখন।জামায়াতে ইসলামী সেই আসামীদেরই তাদের পক্ষে আনার সুযোগ গ্রহণ করে।পত্রিকায়ও সংবাদ হয়েছে-কোথাও হয়তো যুবলীগ কিংবা ছাত্রলীগ কর্মী গ্রেফতার হয়েছে।জামায়াতের লোকজন সেই ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ কর্মীকে থানা থেকে তদবির করে ছাড়িয়ে এনেছে।ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের ছাড়িয়ে আনার কারণে যেমন তারা জামায়াতের প্রতি দুর্বল হয়েছে।অন্যদিকে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের ছাড়িয়ে আনার কারণে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার পুনর্বাসনের অভিযোগ আনার কারণে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থক কিংবা তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের দূরত্ব আগের চেয়ে বাড়তে থাকে।
উল্টোদিকও আছে।বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হওয়ার পরও,দুটি দলই মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে।আওয়ামী লীগের ভোটাররা অনেকেই বিএনপিকে তাদের বিকল্প পছন্দের হিসেবে মনে করতে পারে।এক্ষেত্রে বিএনপি বাদি হয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার পরও একটি অংশ ভোট বিএনপি পেয়ে যাবে। বোধ করি এই সংখ্যাটা খুব একটা কম হবে না।
তারপর একটি অংশ ভোটার নীরব পর্যবেক্ষক হয়ে সময় নিচ্ছে।তারা খুটিয়ে দেখছে কোন দল কি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। এক্ষেত্রে বিশ্লেষণে আসছে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির ইশতেহার এবং সভাসমাবেশে তাদের বক্তৃতা-স্লোগান,পোস্টার-ব্যানার।
বড় ধরণের একটা হোচট খাচ্ছে এবারের ভোটাররা।প্রথম হোচট খায় গণভোট প্রসঙ্গে।যা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি করেছে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই।এবং এই বিতর্ক শুধু ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোট নয় সংসদ নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে।জুলাই সনদে বিএনপি সই করলেও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রসঙ্গ বাদ পড়ায় তাদের আপত্তি শুরুতেই ছিলো।এমনকি আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য যথাক্রমে মির্জা আব্বাস ও মেজর হাফিজ গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে থাকার কথা বলেছিলেন। আবার ইশরাক হোসেনের মতো অনেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোট নয় এমন প্রচারণাও চালিয়েছিলেন। হয়তো বা জুলাইযোদ্ধাদের প্রশ্নের মুখেও পড়তে পারে বিএনপি।সর্বশেষ বিএনপি চেয়ারম্যান দলীয় সিদ্ধান্ত ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে এমন মন্তব্য করেন।এরপরও বিএনপি প্রার্থীরা ৩১ দফা কেন্দ্রিক ইশতেহারকেই তাদের প্রচারণায় প্রাধান্য দিচ্ছে।সুতরাং সুইং ভোটারদের দ্বিধা থেকেই যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর অনেক প্রার্থীর ব্ক্তব্য এমনকি তাদের দলীয় ইশতিহারও ভোটারদের কাছে অস্পষ্ট এখনও।বিশেষ করে কিছু প্রার্থী ধর্মকে ব্যবহার করে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ায় অনেক ভোটার বুঝতে পারছে না এই জামায়াতে ইসলামী আগের ধারায় আছে কি না।‘আল্লাহর আইন চাই সৎ লোকের শাসন চাই’ বলে জন্মলগ্ন থেকে যে জামায়াতে ইসলামী মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে, সেই জামায়াতে ইসলামীর আমির যখন বলেন জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন চালু করবে না, তখন ভোটাররা থমকে যায়।আবার আমির হামজা,শাহজাহান চৌধুরী কিংবা ব্যারিস্টার শিশির মনিরের দেওয়া কিছু বক্তব্য দলটির বর্তমান অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।ধর্মভীরু মুসলমানদের অনেকেই জামায়াতে ইসলামীর আগের পথ থেকে সরে আসাটাকে তাদের স্ববিরোধিতা হিসেবে দেখছে।
এনসিপির ইশতেহার এবং নেতাদের বক্তব্য ও প্রচারণায় জুলাই সনদ ও ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রাধান্য পাচ্ছে।ইশতেহার ছাড়াও তারা একইভাবে একই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।এরপরও জুলাই সনদে সই না করে জনগণকে জুলাই সনদের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানানোটাকে অনেকেই স্ববিরোধিতা মনে করছে। কিন্তু দলটির গ্রহণযোগ্যতা তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি বিধায় ভোটারদের আগ্রহ খুব একটা বেশি নেই।তারপরও দলের ভাঙনও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।দলের সিনিয়র নেতারা দল ত্যাগের কারণই শুধু নয়, দলটি জামায়াতে ইসলামীর জোটে যাওয়ায় অনেক ভোটারও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।
এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মাঝখানে আবার আওয়ামী লীগ ভোট বর্জনের ডাক দিয়েছে।যদিও এই ডাক শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ, তারপরও এর প্রভাবও যে একবারেই পড়বে না তা বলা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কপাল খোলার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সবশেষে এটা বলা যায়, সুইং ভোটারদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন না, যার প্রভাব পড়তে পারে ভোটে।
লেখক-সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।
এইচআর/এএসএম