ফিচার

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে শৈশবের রঙিন দিনগুলো যেমন ছিল

জাতীয় নির্বাচন মানেই এখন আমাদের কাছে দায়িত্ব, সচেতনতা আর নাগরিক অধিকার। কিন্তু শৈশবে নির্বাচন মানে আমাদের কাছে ক্ষমতার লড়াই নয় বরং ছিল উৎসবের মতো এক ব্যস্ততা, রঙিন পোস্টার আর মিছিলে পাওয়া বাদাম-চকলেটের আনন্দ। বিশেষ করে গ্রামের শিশু-কিশোরদের কাছে নির্বাচন মানেই ছিল রঙিন এক অভিজ্ঞতার নাম।

নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে আমাদের গ্রামের চেহারা বদলে যেত। গাছে গাছে ও দেয়ালজুড়ে নানা প্রতীকের পোস্টারের দেখা ছড়াছড়ি। রঙের বাহার দেখে মনে হতো যেন পুরো এলাকা এক বিশাল চিত্রশালা। মাইকিং চলতো ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ‘ভোট দিন অমুক প্রতীকে ভোট দিন।’ সেই শব্দে ঘুম ভাঙতো, আবার সেই শব্দেই রাত নামতো। নির্বাচনের মাইকিংয়ের শব্দ পেলেই ছুটে যাওয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতীকে স্লোগান দেওয়া আর তাদের থেকে লিফলেট সংগ্রহ করে ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। তা বাড়িতে এসে বিমানসহ নানা রকমের খেলনা তৈরিই ছিল প্রধান কাজ।

বিশেষ করে ভোটের দিনটি ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলেই মাঠেই বসতো ভোটকেন্দ্র। লম্বা লাইন দেখে লোকজন গণনা করতাম কোন লাইনে কতজন আছে। যা ছিল সবচেয়ে আনন্দের। কিছু সময় পর পর সেনাবাহিনী, পুলিশ আর আনসার সদস্যদের বাঁশি শব্দ এবং ভিড় দূর করার জন্য লাঠি নিয়ে দৌড়ানো দেখা ছিল এক ধরনের রোমাঞ্চ। তবে ভোটের দিন খাওয়া দাওয়া একটা ধুম পড়ে যেতো। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে বসতো হরেক রকমের খাবারের দোকান।

আরও পড়ুনইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তিযে দেশে প্রার্থী একজন হলেও ভোট পড়ে শতভাগ

এছাড়া সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল নির্বাচনের পোস্টার সংগ্রহ করা। ফল ঘোষণার রাতে বা ভোটের পর দিন পোস্টার সংগ্রহের একটা প্রতিযোগিতা চলতো। গাছে গাছে টানানো পোস্টার খুলে যত্ন করে রেখে দিতাম, পরে তা দিয়ে বইয়ের মলাট বানাতাম। প্রতীকের ছবি দেখে বন্ধুরা আন্দাজ করত, কার বইয়ে কোন দলের পোস্টার। এতে এক ধরনের গর্বও কাজ করত, যদিও রাজনীতির অর্থ তখনো অজানা।

নির্বাচনি মিছিল ছিল আমাদের আরেক আকর্ষণ। পাড়ায় মিছিল এলে আমরা দৌড়ে গিয়ে লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে যেতাম। স্লোগান দিতে না পারলেও গলা মিলিয়ে আওয়াজ তুলতাম। মিছিল শেষে কখনো বাদাম, কখনো চকলেট বা বিস্কুটও মিলত। কখনো একচাপ চায়ের জন্যও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম। ফল ঘোষণার দিনও কম উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না। টেলিভিশনের সামনে বসে বড়রা ফল শুনতেন। কে জিতল, কে হারল এসব নিয়ে আলোচনা চলত রাতভর। সেই রাতে কোনো কোনো এলাকায় বিজয় মিছিল বের হতো, ঢাক-ঢোল বাজত। সেই আনন্দের ঢেউ আমাদের মনেও ছড়িয়ে পড়ত।

আবারও নির্বাচন ফিরে এসেছে, তবে কর্মের চাপে ঢাকা থেকে বাড়িতে যাওয়া আর হলো না। এখন বড় হয়েছি, বুঝি নির্বাচনের গুরুত্ব কত গভীর। এটি শুধু উৎসব নয়, গণতন্ত্রের চর্চা। কিন্তু শৈশবের চোখে দেখা নির্বাচন ছিল এক নির্মল আনন্দের নাম। পোস্টারের রঙ, মিছিলে পাওয়া বাদামের স্বাদ, ভোটকেন্দ্রের ভিড় সব মিলিয়ে সেই দিনগুলো আজও স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল।

এ দিকে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নিজেদের শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলোর কথা শেয়ার করেছেন কালবেলার সাব এডিটর আবু তালহা রায়হান, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ আজম এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান কাব্য।

কাব্য বলেন, ভোটার হওয়ার থেকেও ভোটারহীন শৈশব যেন আরও মধুর ছিল। মাইকিং এ মার্কা বা প্রার্থী সম্পর্কে ভালো বুঝতে না পারলেও এগুলো ছিল তুমুল আগ্রহের বিষয়। ভোট আসলে পোস্টারগুলো ছিল আমাদের সব থেকে পছন্দের বস্তু। নিজ আসনের সব প্রার্থীর পোস্টার সংগ্রহ করা, আর সেগুলো নিজের কাছে যত বেশি, তত নিজেকে এগিয়ে রাখা হতো।মাইকিং করতে আসা গাড়িগুলোতে হ্যান্ড লিফলেট দিত, তাই ভোটের মাইকিং আসলেই পিছে দৌড়াতাম। শৈশবে কত হ্যান্ড লিফলেটের প্লেন বানিয়ে উড়িয়েছি, সেই সংখ্যাটা সহস্র ছড়াবে।

গ্রামের উঠোন বৈঠকে আসা প্রার্থী সমর্থকরা নিয়ে আসতো খুরমা-চকলেট অথবা জিলাপি। সেদিক থেকে ছোট মানুষরা এগিয়েই থাকতো, আমিও তার বাইরে না। প্রার্থীদের কাছে গেলেই চকলেট, লিফলেট, বাদাম দিতো। এগুলোও প্রিয় ছিল। আর বেশিরভাগ মিছিলে থাকতো মানুষের ভালুক, বাঘ সাজা। সেই সময়ে মিছিলে অংশ নিতাম এসব উদযাপন করতেই।

ভোটের দিনগুলোতে আব্বা-মা ভোট কেন্দ্র থেকে দূরে থাকতে বললেও খুব কাছাকাছি থাকা হতো। নির্বাচন যেন আরও আনন্দময় হতো যখন এলাকার সব মানুষকে একত্রে দেখতাম। আব্বা- মা ভোট দিয়ে আসলে তাদের আঙুলে কালি নিয়ে আমার প্রশ্ন ছিল অনেক। এগুলো কেন দেয়? এগুলো উঠে না কেন? না দিলে কি হতো? ইত্যাদি। এবার বিশ্ববিদ্যালয় ছুটিতে বাড়িতে এসে ছোট বাচ্চাদের লিফলেট নিয়ে আগ্রহ দেখে মাঝে মাঝে নিজেকে সেই মধুর শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাই।

আজম বলেন, সময়টা ২০০৮। বয়স তখন এতটাই কম যে রাজনীতি বুঝতাম না, কিন্তু নির্বাচনের উৎসবটা ঠিকই বুঝতাম। আমাদের কাছে ভোট মানেই ছিল আনন্দ, কৌতূহল আর এক ধরনের অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। বড়দের চেয়ে হয়তো আমাদের উৎসাহই ছিল বেশি। নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হলেই যেন পাড়া-মহল্লায় উৎসব নেমে আসত। বড় সড়ক ধরে যখন ভ্যান বা রিকশায় মাইক বাজিয়ে প্রার্থীদের প্রচার চলত, সমবয়সীরা দল বেঁধে দৌড়ে যেতাম। মাইকের পিছু পিছু কত দূর যে চলে যেতাম, তার হিসাব নেই। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়া, পরিচিত গলি পেরিয়ে অচেনা রাস্তায় পৌঁছে যেতাম। ফেরার পথে স্লোগান দিতাম গলা ফাটিয়ে। যে প্রার্থীর মাইক শুনতাম, তখনই তার স্লোগান; নির্বাচনি প্রতীক বদলাত, স্লোগান বদলাত, কিন্তু আমাদের আনন্দ বদলাতো না।

ভোটের দিন ছিল আলাদা রকমের উত্তেজনায় ভরা। অনেক সময় আগের রাতেই মাকে বলে রাখতাম, যেন ভোরে ডেকে দেন। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড় দিতাম বড় সড়কে। রাতের আঁধারে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হতো প্রতীক ছাপানো ছোট ছোট রঙিন কাগজ। পরে আমরা বেছে বেছে উজ্জ্বল রঙের কাগজ কুড়িয়ে পকেটে বা পলিথিনের ব্যাগে ভরতাম। কে কত বেশি জমাতে পারল তা নিয়েই চলতো আমাদের গর্ব আর প্রতিযোগিতা। রাজনীতির অর্থ বুঝতাম না, কিন্তু উৎসবের রং বুঝতাম ঠিকই।

সময় বয়ে গেছে অনেক। সেই দিনগুলো এখন স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি। একসময় ভোট মানেই ছিল ঈদের মতো আনন্দ, চেনা মানুষদের ভিড়, কৌতূহলী চোখ। এখন সেই উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে না তেমন। ডিজিটাল যুগে মানুষ যেন পর্দার ভেতরেই আটকে গেছে। মাঠের কোলাহল সরে গিয়ে জায়গা নিয়েছে নীরব স্ক্রিনের আলো।

তবু মাঝেমধ্যে মনে হয়, আসলে হারিয়ে গেছে শুধু সময়টাই নয়, হারিয়ে গেছে এক টুকরো সরলতা। রাজনীতির জটিলতা নয়, শৈশবের নির্মল আনন্দটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই সোনালি দিনগুলোকে ভীষণ মনে পড়ে। ইচ্ছে হয়, আরেকবার ফিরে যাই সেই ভোরের রঙিন কাগজ কুড়োনো সকালে, যেখানে ভোট ছিল উৎসব, আর আনন্দ ছিল নিঃস্বার্থ।

তালহা বলেন, শৈশবের একটি নির্বাচনের দিনের কথা আজও মনে আছে। তখন খুব ছোট, ভোট দেওয়ার বয়স হয়নি। সেই ভোটের দিন সকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির পাশের কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। মানুষের ভিড়, লম্বা লাইন, পুলিশ পাহারা সবকিছু কৌতূহল নিয়ে দেখছিলাম। এক সময় দেখলাম, কেন্দ্র থেকে বের হয়ে অনেকে আঙুলের কালি দেখাচ্ছে। বিষয়টা বেশ মজার লাগছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে কৌতূহল থেকে একে অপরের আঙুলে কলমের কালি লাগিয়ে বলছিলাম, আমরাও ভোট দিয়েছি। বিষয়টি এখন মনে হলে হাসি পায়, কিন্তু তখন সেটাই ছিল আমাদের আনন্দ।

ভোট দিতে না পারলেও নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা, মানুষের ভিড় আর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কাটানো সময়; এসব মিলিয়েই শৈশবের নির্বাচন ছিল আনন্দ আর কৌতূহলে ভরা এক স্মৃতি।

আরও পড়ুনভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারের কাজ কি?গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে কীভাবে?

কেএসকে