জাতীয়

সৌদিফেরত রিজিয়াকে ১৩ দিন পর ফিরে পেলো পরিবার

অবেশেষে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা সেই রিজিয়া বেগমকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর উত্তরার ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন রিজিয়া। তবে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ছিল অসংলগ্ন। তিনি নিজের ঠিকানা বা পরিবারের ফোন নম্বর কিছুই মনে করতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (অ্যাভসেক) সদস্যরা তার সঙ্গে কথা বলেন। পরে তার মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক নিরাপদ আবাসন ও পরিবারের সন্ধানের জন্য ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর টানা ১৩ দিন ধরে ওই নারী মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে অবস্থান করছিলেন। ব্র্যাকের মনোসামাজিক কাউন্সেলর ও প্রশিক্ষিত কর্মীরা তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেছেন। তবে তিনি নিজের সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তার কাছে কোনো পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত নথিপত্রও পাওয়া যায়নি। শুধু বিমানের একটি টিকিট ছিল। সেখানে প্রাথমিক পরিচয় রিজিয়া বেগম,⁠ ⁠পিতা/স্বামী: আব্দুর নুর, শুধু এতটুকু উল্লেখ ছিল। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় তার গ্রামের ঠিকানা বের করা হয়।

পিবিআই আঙুলের ছাপ ও জাতীয় পরিচয়পত্র মিলিয়ে ওই নারীর পরিচয় নিশ্চিত করে। রিজিয়ার গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন তিনি মারা গেছেন।

রিজিয়াকে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান জানান, সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে নির্যাতনের শিকার নারীরা দেশে ফেরার পর প্রাথমিকভাবে কথা বলতে পারেন না। রিজিয়া ১৩ দিন সেন্টারে ছিলেন। প্রথমে শুধু ‘মুসলিম’ শব্দটি বলতেন। এরপর পিবিআইয়ের সহায়তায় তার ঠিকানা শনাক্ত করা হয়।

তিনি বলেন, এ ধরনের নারীদের দেশে ফেরার পর কোন দপ্তর কী করবে, তা জানা নেই। যাদের কারণে নারীরা এই দুর্ভোগে পড়েন, তাদের বিচার না হলে এমন পরিস্থিতি চলবেই। রাষ্ট্র, সরকার ও সামাজিক সংস্থা মিলে এ ধরনের নারীদের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

রিজিয়ার মেয়ে লিজা আক্তার বলেন, আম্মু ২০১৯ সালে ঢাকার এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। ২০২১ সালের পর মায়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ব্র্যাক সদস্যরা বাড়িতে এসে জানান মা ফিরে এসেছেন। দেখি, তার চেহারায় এত কষ্টের ছাপ যে চিনতেই পারছিলাম না।

সংবাদ সম্মেলনে সৌদিফেরত আরেক নারী রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার নিপীড়নের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে এতিমখানায় বড় হয়েছিলেন। পরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। স্বামীর পরিত্যাগের পর দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে চারবার বিক্রি করা হয় এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিরাপদ আবাসন ও চিকিৎসার জন্য গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে ফেরেন।

অনুষ্ঠানে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সহকারী পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ভুঞা, ব্র্যাকের ইনচার্জ শরিফুল ইসলাম, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) কর্মকর্তা মাহবুব আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এমএমএ/এমকেআর