জাতীয়

‘গ্যাস নিয়ে ঝামেলায় আছি, রান্না করতে গেলে মেজাজ খারাপ হয়’

‘গ্যাসের চাপ নেই৷ চুলা মিটমিট করেও জ্বলে না৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলায় রান্না চাপিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। বসে থাকি, কখন রান্না শেষ হবে। রমজানে আরও বেশি সমস্যায় পড়েছি। সময়মতো রান্না শেষ করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ গ্যাস সংকটে থাকা রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা হুসনে আরা এভাবেই নিজের ভোগান্তির কথা বলছিলেন।

শুধু হুসনে আরা নন, রমজানে তার মতো ঢাকার অসংখ্য পরিবার একই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বাসায় গ্যাস সংযোগ থাকলেও তাদের কারও কারও চুলা জ্বলছে একেবারে টিম টিম করে, আবার কেউ কেউ গ্যাসের চাপ একদমই পাচ্ছেন না। রোজার দিনে এমন ভোগান্তি নিয়ে তাদের অসন্তোষ আর ক্ষোভের শেষ নেই।

রমজানে রাজধানীর সাধারণ মানুষ গ্যাস সংকটের কারণে দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে গৃহিণীরা ইফতার ও সেহরির জন্য সময়মতো রান্না করতে পারছেন না। অনেক বাসায় চুলার লাইনে গ্যাস নেই, ফলে খাবার তৈরিতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

যেসব পরিবার আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা ইনডাকশন চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের মাধ্যমে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন। তবে অনেকের জন্য এটি সম্ভব নয়, ফলে প্রতিদিনের রান্না তাদের জন্য এখন বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মিরপুর, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, আজিমপুর, নিউমার্কেট, কলাবাগান, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, তালতলা ও দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে৷

এসব এলাকার গৃহিণীরা বিকেলে ইফতার প্রস্তুত করা এবং মাঝ রাতে সেহরির রান্না নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় থাকেন৷ লাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের৷

আরও পড়ুনরাজধানীতে গ্যাস সংকটে অনেক বাসায় রান্না বন্ধ, ভোগান্তিতে নগরবাসীএলএনজি টার্মিনালে ফের ত্রুটি, গ্যাস সংকট বাড়ছেদাম নিয়ে ‘অরাজকতার’ পর এলপিজি আমদানিতে বিপিসির তোড়জোড়

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রাফিক মিনহাজ জাগো নিউজকে বলেন, বাসায় লাইনের গ্যাস আছে, নিয়মিত বিলও পরিশোধ করা হয়। কিন্তু গ্যাস তো ঠিকঠাক পাই না। এখন যা অবস্থা- লাইনের গ্যাসের ওপর ভরসা করলে না খেয়ে থাকতে হবে৷ বাধ্য হয়ে তাই সিলিন্ডার কিনেছি৷ এতে খরচ বেড়েছে।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আকলিমা আক্তার বলেন, গ্যাস নিয়ে খুব ঝামেলায় আছি। রান্না করতে গেলে মেজাজ খারাপ হয়। একবার চুলায় রান্না বসিয়ে কতক্ষণ বসে থাকা যায়! জানি না এই ভোগান্তি থেকে কবে মুক্তি পাবো৷

দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এলএনজি থেকে প্রাপ্ত গ‍্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের দিকে এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)।

এদিন দুপুরে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, কয়েকদিন আগে একটা এফএসআরইউ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমে গিয়েছিল। সেটিতে আবারও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে৷ ফের মেরামত করতে হবে৷ অলরেডি সরবরাহ কমে গেছে৷

এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মেরামতের জন্য এলএনজি টার্মিনালটি বন্ধ থাকে৷ টানা দুদিন পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এক সপ্তাহ না যেতেই আবারও গ্যাস সংকট বেড়েছে।

দেশে গ্যাসের বহুমুখী ব্যবহারের মধ্যে বাসাবাড়ির রান্নার পাশাপাশি শিল্প খাত, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার হয়। এছাড়া পরিবহন খাতেও গ্যাসের ব্যবহার হয়।

আরও পড়ুনসিলিন্ডার গ্যাস নিয়ে অরাজকতার মধ্যে পাইপলাইনের গ্যাসও নিভু নিভু১৩০০ টাকার এলপি গ্যাস দুই হাজারেও মিলছে না

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন সরকারের সামনে এ মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা। যদি সেটি না হয় তবে জনভোগান্তি বাড়বে। এছাড়া শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হতে পারে। এতে সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

যদি এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তবে শুধু রমজানেই নয়, অন্য মাসগুলোতেও গ্যাস সংকট মানুষকে ভোগাবে। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরা একটা অপেক্ষায় ছিলাম নতুন সরকার এলে অফশোর (সমুদ্র) এক্সপ্লোরেশন শুরু হবে। এটা করে ফেলতে হবে। আর অনশোর (ভূমি) এক্সপ্লোরেশনটাও বাড়াতে হবে।

বিদ্যমান গ্যাস বিতরণ লাইন না বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এমন যেন না হয় জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে আবার কোনো এমপি নিজ জেলায় গ্যাসলাইন নিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

এনএস/এমকেআর