সাত দেশে চিঠি
দাম নিয়ে ‘অরাজকতার’ পর এলপিজি আমদানিতে বিপিসির তোড়জোড়
সরকারের অনুমতির পর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির জন্য উৎস নিশ্চিত করতে সাত দেশের ৯ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিপিসি পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে থাকে। ২১ জানুয়ারি বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণিলাল দাশ এ চিঠি দেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- সিঙ্গাপুরের পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর) প্রাইভেট লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেড, ইউনিপেক সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড, মালয়েশিয়ার পিটিএলসিএল, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন, কুয়েতের কেপিসি ট্রেডিং লিমিটেড, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (ইনোক), থাইল্যান্ডের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড এবং ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল)।
তবে বিপিসির এ উদ্যোগের বেশ আগেই এলপিজির দাম নিয়ে সারাদেশে অরাজকতা চলছে। সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে না কোথাও। এমনকি দ্বিগুন দামেও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে।
কথা হয় বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণিলাল দাশের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, সরকারের অনুমোদনের পর প্রাথমিকভাবে আমদানির উৎস নিশ্চিত করতে আমাদের তালিকাভুক্ত ৯ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যারা সরবরাহ করতে আগ্রহ দেখাবেন, তাদের কাছ থেকে পরবর্তীতে কোটেশন চাওয়া হবে। জি-টু-জি ভিত্তিতে এসব এলপিজি আমদানি করা হবে।
তিনি বলেন, আমরা এরইমধ্যে দুই পর্যায়ে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে মিটিং করেছি। চট্টগ্রামের অপারেটরদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছি। ঢাকাসহ বাইরের অপারেটরদের সঙ্গে অনলাইন প্লাটফর্মে আলোচনা হয়েছে। তারা সবাই সরকারিভাবে আমদানিকৃত এলপিজি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
আরও পড়ুন
তিনি আরও বলেন, আমরা যে এলপিজি আমদানি করবো তা ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় সাশ্রয়ী হবে কি না তাও আলোচনা করতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি এলপিজির দর নির্ধারণ করে দেয় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কোটেশন নেয়ার পর বিইআরসির সঙ্গে আলাপ করে তাদের নির্ধারিত দরের মধ্যে আমরা অপারেটরদের সরবরাহ করতে পারবো কি না তা নিশ্চিত করা হবে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- বিপিসি সেল পার্সেজ এগ্রিমেন্টের আওতায় তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, জেট এ-১, ফার্নেস অয়েল, অকটেন আমদানি করছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিপিসি এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করছে। দুইটি বিকল্প বিবেচনায় নিয়েছে বিপিসি। এর মধ্যে একটি পার্সেলের আকার হবে ৫-১০ হাজার মেট্রিক টনের। যা চট্টগ্রামে সরবরাহ করতে হবে এবং এসব এলপিজি বিপিসির মনোনীত প্ল্যান্টের রিসিভিং টার্মিনালে খালাস করা হবে। খালাসের জন্য ১০ দিনের সময় নির্ধারিত থাকবে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, দ্বিতীয় পার্সেলটি হলো প্রতিমাসে কমবেশি ৪০ হাজার টনের। যেটি খালাসের জন্য আনুমানিক ২৫ দিনের মতো সময় লাগবে। সরবরাহকারীকে ৩-৪ টি লাইটার জাহাজ ব্যবহার করে লাইটারেজ করে খালাস করতে হবে। এর মধ্যে একটি লাইটারেজের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫-৭ হাজার মেট্রিক টন এবং অবশিষ্ট ২-৩টি লাইটারের ধারণক্ষমতা ৩ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে হতে হবে।
এর আগে, দেশে সংকট তৈরি হলে বিপিসি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এলপিজি আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করে গত ১০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেয়। গত ২০ জানুয়ারি বিপিসিকে তিন শর্তে এলপিজি আমদানির অনুমতি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহিনা আকতারের সই করা ওই চিঠিতে দেশের এলপিজি বাজারে বিদ্যমান কৃত্রিম সংকট ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ এবং স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিপিসি কর্তৃক এলপিজি আমদানির নিমিত্তে বিদ্যমান নীতিমালা ও প্রচলিত বিধি-বিধান প্রতিপালন এবং তিনটি শর্ত পালনের কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, শর্তগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো- এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনাপূর্বক আগ্রহী অপারেটর প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুতকরণ, আমদানিতব্য এলপিজির পরিমাণ নির্ধারণ, মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি, খালাস ও বন্টন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়সমূহ এ বিভাগের অনুমতিক্রমে বিপিসি নির্ধারণ করবে। দ্বিতীয়টি হলো- বিপিসির তালিকাভুক্ত জি-টু-জি সরবরাহকারী এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যান্য সম্ভাব্য উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি কিংবা কোটেশন আহ্বানের মাধ্যমে বাল্ক আকারে এলপিজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাইপূর্বক প্রচলিত বিধি-বিধান প্রতিপালন সাপেক্ষে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫ এর ১০৫ ও ১০৭ নং বিধি অনুযায়ী অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) পূর্বানুমোদন গ্রহণের নিমিত্ত প্রস্তাব পাঠাবে। তৃতীয় শর্ত হলো- বাল্ক আকারে আমদানিকৃত এলপি গ্যাস শুধু অনুমোদিত অপারেটরদের কাছে সরবরাহ করা যাবে। তবে বিপিসি কোন ধরনের বোতলজাতকরণ কার্যক্রমে অংশ নেবে না।
এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে বর্তমানে বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে গত অক্টোবর মাসে ইরান থেকে তেল ও এলপিজি আমদানি এবং পরিবহনে সহায়তাকারী ৫০টিরও বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। এতে দেশে আমদানি করা এলপিজি পরিবহনের জাহাজের সংকট তৈরি হয়। আবার দেশেও এলসি জটিলতার কারণে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গত ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। পাশাপাশি শীতের সময়ে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ায় বাজারে এলপিজির সংকট তৈরি হয়।
দেশে এলপিজির সরবরাহ ঘাটতির সুযোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডারে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকাও বেশি আদায় করতে শুরু করে। আবার চাহিদামাফিক গ্যাস না পেয়ে বেকায়দায় পড়েন সাধারণ ভোক্তারা।
বিপিসি বলছে, ১৫ বছরে দেশে এলপিজির বাজার বেড়েছে ২৫ গুণ। এলপিজি প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর ও বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০ প্রতিষ্ঠানের কাছে এলপিজি আমদানি ও বটলিং করার অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি করার টার্মিনাল রয়েছে ২৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে। অন্য সাত প্রতিষ্ঠান আমদানিকারকদের কাছ থেকে এলএনজি কিনে স্যাটেলাইট ফিলিং পয়েন্টের মাধ্যমে এলপিজি বটলিং করে বাজারজাত করে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৬ হাজার ২০০ টন এলপিজি আমদানি করে। পাশাপাশি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি উৎস থেকে সরকারি এলপিজিএলসহ বেসরকারি তিন রিফাইনারি মিলে সরবরাহ করেছে ৪৫ হাজার ৬৩০ টন। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টন এলপি গ্যাস উৎপাদন ও আমদানি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা থাকলেও ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে কম এলপিজি আমদানি হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৩৭ টন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২ টন। আগের বছরের চেয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৮ হাজার ৮৭৫ টন এলপিজি কম আমদানি হয়েছে।
চলতি (জানুয়ারি) মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গত মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫) দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। এর আগের মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা। যদিও গ্রাহককে কিনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে।
এমডিআইএইচ/এএমএ