আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নৌপথে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ২৬টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বেও রয়েছেন। এ সময় নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজিব আহসান উপস্থিত ছিলেন।
নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, রমজান চলছে, ঈদ সমাগত- এ সময় ঢাকার মানুষ যেন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মানসম্মতভাবে ঢাকার বাইরে যেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই নিয়মিত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আজ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের করণীয় বিষয়গুলো আগে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিতে সেগুলো বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। গতবারের যাত্রা মোটামুটি স্বস্তিদায়ক ছিল। এবার সেটিকে আরও ভালো ও মনোরম করতে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে এবং সবার পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
ঈদের পাঁচ দিন আগে এবং পাঁচ দিন পরে ঢাকামুখী ও ঢাকা থেকে বাইরে যাওয়ার যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে ২৬টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান নৌপরিবহন মন্ত্রী।
সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যাবে না এবং ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত এলাকা যানজটমুক্ত রাখতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন। সেখানে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। অবৈধ পার্কিং ও দোকানপাট থাকবে না। সদরঘাট টার্মিনালে কুলিদের কোনো দৌরাত্ম্য থাকবে না।
যাত্রী হয়রানি বন্ধ করা হবে। নির্ধারিত সময়েই লঞ্চ ছেড়ে যাবে। পথে বাল্কহেড বা স্পিডবোটের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ রাখা হবে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড এ বিষয়ে তদারকি করবে। দুষ্কৃতকারীরা যাতে নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে এবং প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ভাড়া বাড়ানো যাবে না- এ বিষয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট নিয়মিত তদারকি করবে।
ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং ঈদের পরে পাঁচ দিন বাল্ক হেড চলাচল বন্ধ থাকবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় একটি অপরাধ, এর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি থাকবে বলেও জানান মন্ত্রী।
আরও পড়ুনঈদে টিকিট ছাড়া ট্রেনে ভ্রমণ ঠেকাতে সব বড় স্টেশনে নজরদারি থাকবে ১৯ মার্চ রাত থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ
পরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভায় রাতে স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দিনে স্পিডবোটে যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরিধান নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১৭ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দ্রুত পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ রাখা হবে, যাতে যাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন থাকে।
এতে আরও জানানো হয়, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। লঞ্চের ছাদে যাত্রী ওঠানো যাবে না। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা সব নদীবন্দর, টার্মিনাল, ঘাট ও নৌযানে দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের অভিযোগ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট নৌযানের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলসহ মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট ও স্পিডবোট ঘাটে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে।
বিজিএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যেসব গার্মেন্টসে জরুরি অর্ডার নেই, তারা পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের ছুটির ব্যবস্থা করবেন। জাতীয় সেবায় ব্যবহারের জন্য ঈদের আগেই দুটি বড় জাহাজ উদ্বোধন করা হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নৌপথে ফিটনেসবিহীন নৌযান ও ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সব নৌযানকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং সিরিয়াল ভঙ্গ বা অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর মাঝপথ থেকে যাত্রী ওঠানো বন্ধে কঠোর নজরদারি থাকবে। নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ করে রাতে টহল জোরদার করা হবে।
যাত্রী নিরাপত্তা জোরদারে ১৫ রমজান থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত প্রতিটি লঞ্চে ন্যূনতম চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে প্রত্যেক ঘাট এলাকায় ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হবে। পাশাপাশি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং টিম গঠন করে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হবে বলেও জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
এক প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন মন্ত্রী জানান, বিআইডব্লিউটিএর বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সুপারিশের ভিত্তিতে আগের প্রকল্প পরিচালক এবং আরেকজন কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো ধরনের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। যারা অনিয়ম করেছেন, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
দুজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর বণ্টনের অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘না, অনুরোধ করেছি। এটা যেভাবে যাওয়ার দরকার সেক্রেটারি সাহেব সেভাবে করেছেন এবং আমি সই করে বলেছি যে ওটা আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, যে দপ্তরগুলি তো আসলে একসঙ্গে প্রায় তিনটা মন্ত্রণালয় বলা হলেও চারটার কাছাকাছি মন্ত্রণালয়। তো তখন ওই তিনজনেই না দেখে কীভাবে কাজটাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে করা যায়, সেজন্য ওইটা এভাবেই যায়। প্রক্রিয়াটা যেভাবে যায় সেভাবেই গিয়েছে। সেভাবেই গিয়েছে। আপনি হয়তো এটা অন্যভাবে জেনেছেন বা অন্যভাবে দেখছেন। যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ওখান থেকে তাদের পরামর্শ যেভাবে পাঠাতে হয় সেভাবে পাঠানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত তারাই দেবেন।’
আরএমএম/কেএসআর