অর্থনীতি

দেশের সব বিমা কোম্পানি এখন ‘অবৈধ’

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের সব ধরনের বিমা কোম্পানিকে নিবন্ধন নবায়ন সম্পন্ন করতে হয়। নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে কোম্পানিগুলো আবেদনও করেছে। তবে বাড়তি ফি আদায়ে দুই মাস পেরোলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন অনুমোদন করেনি।

আইনি ব্যাখ্যায় সব বিমা কোম্পানি বর্তমানে কার্যত নবায়নবিহীন অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের কার্যক্রম এখন কার্যত ‘অবৈধ’। যদিও বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত রয়েছে আইডিআরএর।

বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের আবেদন ও ফি পরিশোধ করে আইডিআরএর কাছে আবেদন করতে হয়। বিমা কোম্পানিগুলো সময়মতো আবেদন ও ফি জমা দিলে এখনো (২ মার্চ পর্যন্ত) তাদের নবায়ন অনুমোদন করেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ, দাবি নিষ্পত্তি কোনো কাজই করতে পারে না। এখন দেশের সব বিমা কোম্পানিই অবৈধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখানে বিমা কোম্পানিগুলোর কোনো দায় নেই।-প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম

বিমা আইন অনুসারে, বৈধ নিবন্ধন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ বা দাবি নিষ্পত্তিসহ নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে পারে না। তবে বাস্তবে দেশের সব জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিই স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিবন্ধন নবায়নের জন্য প্রতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলো নির্ধারিত ফি দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিসেম্বরের মধ্যে নবায়ন সনদ কোম্পানিগুলোকে দিয়ে দেয়। কিন্তু এবার ফেব্রুয়ারি মাস পার হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন করেনি।

তারা আরও বলছেন, নিবন্ধন নবায়নের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত ব্যবসা বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশনা নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেয়নি। ফলে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু কাগজপত্রে নবায়ন না থাকায় এটি তাদের জন্য অস্বস্তিকর। তাছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রুপ বিমা করতেও সমস্যা হচ্ছে। কারণ তারা গ্রুপ বিমা করার সময় নিবন্ধন নবায়ন আছে কি না তা দেখতে চায়।

আরও পড়ুন

জীবন বিমায় বকেয়া দাবির পাহাড়, বিপর্যয়ে ৭ কোম্পানিবিমা খাতের সম্পদ ৫৮ হাজার কোটি টাকা, বিনিয়োগ ৪০ হাজার কোটিআইডিআরএ’র বিবেচনায় দেশের সেরা বিমা কোম্পানির তালিকায় যারাবিমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়লো

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করার পর ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। আইডিআরএর সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান এম আসলাম আলমের উদ্যোগে ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। মূলত বিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বাড়তি ফি আদায়ের লক্ষ্যে নবায়ন অনুমোদন করা হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন আচরণে এখন সব কোম্পানি কার্যত ‘অবৈধ’ হয়ে পড়েছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করা হলেও বিমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়নের জন্য আবেদন করে গত নভেম্বরে। ফলে আগের ফি দিয়েই কোম্পানিগুলো আবেদন করে। এ কারণে বিমা কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নবায়ন নিতে বাড়তি ফি পরিশোধ করতে নির্দেশ দিয়েছে আইডিআরএ।

নবায়ন না থাকলে বিমা কোম্পানির কার্যক্রম অবৈধ হবে কেন? এটা তো চলমান প্রক্রিয়া। তারা তো আইডিআরএর কাছে আবেদন করেছে। সুতরাং, তাদের আবেদন বাতিল করা না হলে তারা অবশ্যই ব্যবসা করতে পারবে। নিবন্ধন নবায়নের কাজটা চলমান। যেহেতু গেজেট হয়ে গেছে, সুতরাং কোম্পানিগুলোকে গেজেটে উল্লেখ করা হারেই ফি দিতে হবে।-আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি 

এ বিষয়ে গত ১ মার্চ কোম্পানিগুলোকে দেওয়া আইডিআরএর চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা, ২০১২ এর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। এমতাবস্থায় বিধিমালা মোতাবেক ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন সনদ পাওয়ার লক্ষ্যে সংশোধিত বিধিমালা মোতাবেক অবশিষ্ট ফি প্রদান করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।’

বিমা ব্যবসার নিবন্ধন ফি বিধিমালা-২০১২ সংশোধন করে প্রকাশ করা গেজেট অনুযায়ী, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি এক কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করলে পরবর্তী বছরের নিবন্ধন নবায়নের জন্য তাকে ২৫ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।

এরপর ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে হার বাড়িয়ে প্রতি হাজারে ৪ টাকা এবং ২০৩২ সাল ও তার পরবর্তীসময়ের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এই হার ছিল প্রতি হাজারে ১ টাকা।

বর্তমান হার ০ দশমিক ১ শতাংশ থেকে চূড়ান্ত ধাপে ০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হবে। অর্থাৎ, প্রতি হাজারে অতিরিক্ত ৪ টাকা বা ০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে বিমা কোম্পানিগুলোকে। প্রথম ধাপেই (২.৫০ টাকা) কোম্পানিগুলোকে প্রতি হাজারে ১ টাকা ৫০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।

এমন সময়ে ফি বাড়ানো হলো, যখন দেশের বিমা খাতে গ্রাহক আস্থা সংকট, দাবি পরিশোধে বিলম্ব ও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে বাজার সম্প্রসারণ ও গ্রাহক সুরক্ষা জোরদারের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত খাতটির জন্য মিশ্র বার্তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে একটি বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া বিমা ব্যবসা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাড়তি নবায়ন ফি আদায়ের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ দেশের সব বিমা কোম্পানিকে অবৈধ করে দিয়েছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে বিমা কোম্পানিগুলো অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘নবায়ন ফি বাবদ বাড়তি অর্থ নেওয়ার জন্য এখন আইডিআরএ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা নবায়নের আবেদন করেছি নভেম্বর মাসে। বাড়তি ফি নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। এখন এক প্রকার ঘাড়ে বন্ধুক ধরে বিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ ধরনের কার্যক্রম বিমা খাতের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।’

তিনি আরও বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বাড়ানোর কারণে মূলত গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ ব্যয় বাড়ার কারণে বিমা গ্রাহকদের লভ্যাংশের পরিমাণ কমে যাবে। এমনিতেই কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের দাবির টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে বিমার প্রতি মানুষের আস্থা সংকট রয়েছে। এখন গ্রাহকরা কম রিটার্ন পেলে এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও নষ্ট হয়ে যাবে।’

যোগাযোগ করা হলে প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু, প্রিমিয়াম গ্রহণ, দাবি নিষ্পত্তি কোনো কাজই করতে পারে না। এখন দেশের সব বিমা কোম্পানিই অবৈধ। কিন্তু এখানে বিমা কোম্পানিগুলোর কোনো দায় নেই। কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে নভেম্বরেই নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে নবায়ন অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’

অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানোর ফলে ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি হবে কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সাধারণত আইডিআরএ ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন নবায়ন দিয়ে দেয় এবং এক বছরের জন্য নবায়ন সনদ দেওয়া হয়। আমরা আশা করছি আইডিআরএ নিবন্ধন নবায়ন যখনই দিক পুরো এক বছরের জন্য অর্থাৎ, ২০২৬ সালের পুরো সময়ের জন্য দেবে। এক বছরের জন্য অনুমোদন দিলে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি না হলেও গ্রুপ বিমার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো এখন সমস্যায় পড়ছে। কারণ বিদেশি কোম্পানিগুলো গ্রুপ বিমা করার ক্ষেত্রে নিবন্ধন নবায়ন আছে কি না, তার সনদ দেখতে চায়। এখন তো কোনো কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন নেই। সুতরাং, সমস্যা তো হচ্ছেই।’

এখন বাড়তি ফি দিয়ে আবার আবেদন করবেন কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা নবায়নের জন্য আবেদন করেছি নভেম্বর মাসে। নবায়ন ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। আমাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, বাড়তি ফি দেওয়া হবে না। এখন দেখা যাক কি হয়।’

নবায়ন ফি বাড়ানোর ফলে কোন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? এমন প্রশ্ন করা হলে জালালুল আজিম বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়লে বিমা কোম্পানির ব্যয় বাড়বে। ফলে বিমা গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের পরিমাণ কমে যাবে। এমনিতেই কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের ঠিকমতো দাবির টাকা না দেওয়ার কারণে বিমা খাতের ওপর মানুষের আস্থা কম। এখন বেনিফিট কমে গেলে, এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।’

আইডিআরএর পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নবায়ন না থাকলে বিমা কোম্পানির কার্যক্রম অবৈধ হবে কেন? এটা তো চলমান প্রক্রিয়া। তারা তো আইডিআরএর কাছে আবেদন করেছে। সুতরাং, তাদের আবেদন বাতিল করা না হলে তারা অবশ্যই ব্যবসা করতে পারবে। নিবন্ধন নবায়নের কাজটা চলমান। যেহেতু গেজেট হয়ে গেছে, সুতরাং কোম্পানিগুলোকে গেজেটে উল্লেখ করা হারেই ফি দিতে হবে।’

এমএএস/এএসএ