ভারত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গর্সিয়াকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করেছে ইরান। যদিও হামলাটি ব্যর্থ হয়েছে, তবুও এর কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার ও শনিবার মধ্যরাতে দিয়েগো গর্সিয়াকে লক্ষ্য করে ইরান দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। একটি মাঝপথেই বিকল হয়ে যায় এবং অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া এসএম-৩ ইন্টারসেপ্টর দিয়ে প্রতিহত করা হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার তাৎপর্য অন্য জায়গায়—দিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে। এত দূরে হামলার চেষ্টা মানে ইরান সম্ভবত মধ্যবর্তী-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে, যা আগে তাদের ঘোষিত সক্ষমতার চেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন>>ইরানে শীর্ষ নেতারা নিহত, তাহলে দেশ চালাচ্ছে কে?ইরানের সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রে হামলা কেন এক ‘ভয়াবহ মোড়’?হঠাৎ নরম সুর ট্রাম্পের, ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির ইঙ্গিত
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছিলেন, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ এবং এর পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক এই হামলার চেষ্টা সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দিয়েগো গার্সিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণদিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপটি চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। এখানে বোমারু বিমান, পারমাণবিক সাবমেরিন এবং গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে এটি লোহিত সাগরের বাব-আল-মান্দেব প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মালাক্কা প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থান করছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোতে নজরদারি ও দ্রুত সামরিক অভিযান পরিচালনায় এই ঘাঁটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
অতীতে ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের শুরুতে এখান থেকেই বিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সম্প্রতি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে মার্কিন বাহিনীকে এই ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান এই হামলা চালায়। হামলার আগে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছিলেন যে, ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়ে স্টারমার ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন।
দ্বীপটির ইতিহাস ও মালিকানাচাগোস দ্বীপপুঞ্জের অংশ এই দ্বীপটি একসময় ফ্রান্সের অধীনে থাকলেও ১৮১৪ সালে ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে এখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রকে ৫০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়, যা পরে বাড়ানো হয়। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এই দ্বীপপুঞ্জ বিচ্ছিন্ন করাকে অবৈধ ঘোষণা করে।
২০২৫ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করা হলেও দিয়েগো গার্সিয়া ৯৯ বছরের জন্য যুক্তরাজ্যের কাছে লিজে রাখা হয়।
ভবিষ্যৎ প্রভাব কী?বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হামলাটি সফল না হলেও এর প্রভাব বড় হতে পারে। কারণ এত দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার চেষ্টা তেহরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন হিসাব-নিকাশে বাধ্য করবে বিশ্বকে।
তাছাড়া, দিয়েগো গার্সিয়া এর আগে কোনো যুদ্ধে আক্রান্ত হয়নি। এই হামলাচেষ্টার পর মার্কিন ও ব্রিটিশ সামরিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হতে পারে।
ইরান মূলত এই হামলার মাধ্যমে বার্তা দিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে পাল্টা আঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কয়েক হাজার মাইল দূরের নিরাপদ ঘাঁটিও এখন আর অস্পৃশ্য নয়।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকেএএ/