ইরানে শীর্ষ নেতারা নিহত, তাহলে দেশ চালাচ্ছে কে?
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় দেশটির শাসনকাঠামোয় নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা সচিব আলী লারিজানি নিহত হওয়ার পর বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— দেশটিকে আসলে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন কে?
লারিজানি হত্যাকাণ্ড ও নেতৃত্বের শূন্যতা
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দীর্ঘদিনের সচিব আলী লারিজানি ছিলেন দেশটির রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। খামেনির মৃত্যুর পর তিনি পরিস্থিতির হাল ধরার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গত মঙ্গলবার ইসরায়েল তাকে হত্যার ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানির মৃত্যুতে তেহরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের আলোচনার শেষ পথটুকুও বন্ধ হয়ে গেল।
স্টিমসন সেন্টারের ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘ইরানের স্বার্থে এই মুহূর্তে হয়তো লারিজানির উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করা হবে না। কারণ সেটি করলে তাকেও লক্ষ্যবস্তু করে দেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন>>
কে এই আলী লারিজানি?
গোটা পরিবার হারালেও যেভাবে প্রাণে বেঁচে যান মোজতবা খামেনি
ইসরায়েল কেন ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিতে চায়?
ইরানের শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মোজতবা বর্তমানে গুরুতর আহত। এছাড়া তার কোনো প্রশাসনিক বা নির্বাহী অভিজ্ঞতা না থাকায় তেহরানের ‘চেইন অব কমান্ড’ বা আদেশ প্রদানের মূল কেন্দ্রটি এখন কার নিয়ন্ত্রণে, তা নিয়ে চরম অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
‘মোজাইক ডিফেন্স’ ও টিকে থাকার লড়াই
বিশ্লেষকরা বলছেন, খামেনি গত ৩৬ বছর ধরে ইরানকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যা একক কোনো নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়। একে বলা হয় ‘মোজাইক ডিফেন্স’। এই পদ্ধতিতে আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক সামরিক কমান্ডারদের স্বায়ত্তশাসিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া থাকে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না।
দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি মনে করেন, এই পদ্ধতিই ইরানকে এমন চরম মুহূর্তেও পতনের হাত থেকে রক্ষা করছে।
পর্দার আড়ালের প্রভাবশালীরা
ইনস্টিটিউট ফর ওয়ার অ্যান্ড পিস রিপোর্টিংয়ের বিশ্লেষক রেজা এইচ আকবরী এবং স্টিমসন সেন্টারের বারবারা স্লাভিনের মতে, বর্তমানে বেশ কিছু পরিচিত ও অপরিচিত মুখ ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ, সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পরমাণু আলোচক সৈয়দ জলিলি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরমাণু বিশেষজ্ঞ আলী আকবর সালেহি এবং আইআরজিসির সাবেক প্রধান ও বর্তমানে মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মহসেন রেজাই।
নতুন প্রজন্মের কট্টরপন্থিদের উত্থান
ইরানের পুরোনো প্রজন্মের যেসব নেতা ইরান-ইরাক যুদ্ধ দেখে বড় হয়েছিলেন, তারা এখন দৃশ্যপটের বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে এক নতুন তরুণ প্রজন্ম, যারা সিরিয়া ও ইরাকের প্রক্সি যুদ্ধে লড়াই করে পোড়খাওয়া হয়ে উঠেছেন। এই নতুন নেতৃত্ব কূটনীতির চেয়ে সামরিক শক্তিতে বেশি বিশ্বাসী। এর ফলে ইরান দ্রুত একটি ‘সিকিউরিটি স্টেট’ বা সামরিক গোয়েন্দাশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যেখানে আলোচনার চেয়ে সংঘাতই প্রধান হয়ে উঠবে।
আকবরী বলেন, ‘অনেকের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ইরান ক্রমশ একটি নিরাপত্তা রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। ইরানি রাষ্ট্র দ্রুত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে এবং অবশিষ্ট অনেক রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যক্তিত্বদের কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছেন।’
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/