বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য আবারও শুরু হলো ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের দিন গণনা। প্রতিবছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাত মাস সময়কে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উপকূলের ভাষায় এই সময়কালকে বলা হয় ‘বিপদসংকুল সময়’ বা ‘ডেঞ্জার পিরিয়ড’।
এ সময় আবহাওয়া ও ভৌগলিক বিভিন্ন কারণে উপকূলজুড়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী ঝড়, অতিবৃষ্টি, বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং লবণাক্ততার মতো নানা দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে বলেই এ সময়টা তাদের জন্য বিপদকাল। ফলে এই সাত মাস উপকূলবাসীকে থাকতে হয় বাড়তি সতর্কতায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অবস্থান, নিম্নভূমি ও নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রতিবছর প্রাক-বর্ষা মৌসুম থেকে বর্ষা-পরবর্তী সময় পর্যন্ত আবহাওয়ার বিরূপ পরিবর্তন দেখা দেয়। এর ফলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা স্থানীয় জনজীবন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাডেঞ্জার পিরিয়ডে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। সাধারণত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে, যা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এ সময় অনেক সময় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে উপকূলে আঘাত হানার নজির রয়েছে।
আবার বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর আবারও উত্তাল হয়ে ওঠে। তখন সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ অনেক সময় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। এসব ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানলে জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়, যা নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
উপকূলীয় অনেক এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসই সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মাছের ঘের ডুবে যায়। অনেক সময় মানুষের জীবনহানির ঘটনাও ঘটে।
কালবৈশাখী ঝড়ের ঝুঁকিডেঞ্জার পিরিয়ডের শুরুতেই উপকূলীয় এলাকায় দেখা দেয় কালবৈশাখী ঝড়ের প্রকোপ। সাধারণত ১৫ মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ঝড়ের আশঙ্কা বেশি থাকে। হঠাৎ করে সৃষ্ট তীব্র বজ্রঝড়, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাত এ সময় উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
কালবৈশাখী ঝড়ের সময় অনেক সময় ঘণ্টায় ৬০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতির ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এর ফলে ছোট নৌকা ও মাছ ধরার ট্রলার সাগরে বিপদের মুখে পড়ে। বজ্রপাতের ঘটনাও এ সময় বেড়ে যায়, যা মৎস্যজীবীসহ উন্মুক্ত স্থানে থাকা মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
উপকূলীয় এলাকার অনেক মৎস্যজীবী জীবিকার তাগিদে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও সাগরে মাছ ধরতে যান। ফলে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও বেড়িবাঁধের ক্ষতিজুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকালে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। অতিবৃষ্টির কারণে অনেক সময় নদ-নদীর পানি বেড়ে যায় এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে পড়ায় পুরোনো ও জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
উপকূলের কৃষি ও বসতভিটা রক্ষায় এসব বেড়িবাঁধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাব এবং প্রাকৃতিক চাপের কারণে অনেক স্থানে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টির চাপ ও নদীর পানির উচ্চতা বাড়লে এসব বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে।
এতে ফসলি জমি নষ্ট হয়, মাছের ঘের ভেসে যায় এবং অনেক সময় মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক এলাকায় এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে।
লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশডেঞ্জার পিরিয়ডে উপকূলীয় এলাকায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ। জলোচ্ছ্বাস কিংবা নদীর পানির চাপ বাড়লে লবণাক্ত পানি অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এর ফলে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যায় এবং সুপেয় পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে পুকুর ও অগভীর নলকূপের পানি ব্যবহারযোগ্য থাকে না। ফলে অনেক মানুষকে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। তবে একই সঙ্গে বর্ষাকাল অনেক ক্ষেত্রে আশীর্বাদ হিসেবেও আসে। কারণ, বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে উপকূলীয় এলাকার মানুষ কয়েক মাসের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে পারে। অনেক পরিবার ছাদের পানির সংরক্ষণ পদ্ধতি বা পুকুরে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা পানীয় হিসেবে ব্যবহার করে।
আরও পড়ুন: যন্ত্র নয়, এক তরুণের সাহসের প্রতীক এটি জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব: ঋতুবৈচিত্র্যে ছন্দ পতন জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্লাবনের ঝুঁকিডেঞ্জার পিরিয়ডে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি। বর্ষা মৌসুমে পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এর ফলে উপকূলের নিচু এলাকাগুলো নিয়মিত প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
অনেক এলাকায় এই সময় জোয়ারের পানি বসতভিটা ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাবও উপকূলীয় এলাকায় বেশি করে দৃশ্যমান হয় এই সময়টাতেই। ফলে ডেঞ্জার পিরিয়ডে উপকূলবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
সচেতনতার গুরুত্ববিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত আশ্রয়ে যাওয়ার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা জরুরি।
এ ছাড়া বেড়িবাঁধের নিয়মিত সংস্কার, নিরাপদ পানির উৎস তৈরি এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় এসব পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সাত মাস উপকূলবাসীর জন্য সতর্কতার সময়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগই পারে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে।
জেএস/