পাবনায় হঠাৎ উদ্বেগজনক হারে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এদের মধ্যে প্রায় সবাই ৯ বছরের কম বয়সি শিশু। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩২ জন। হাসপাতালে জনবল ও ওষুধের সংকটে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। হাসপাতালের মেঝেতে গাদাগাদি করে চলছে অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা। রোগীর সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছরে এ যাবৎ মোট ১২৫ জন রোগী হামে আক্রান্ত হয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত মার্চ মাসে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৩২ জন রোগী ভর্তি অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে ২৫ ও ৩২ বছর বয়সি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও রয়েছেন। বাকিদের অধিকাংশই ৯ মাস বা এর কম বয়সি শিশু।
সোমবার সকালে সরেজমিনে হাসপাতালে ঘুরে জানা যায়, গত রাতেও অতিরিক্ত ৫ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্থান সংকুলান না হওয়ায় হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে মেঝেতে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। এই ওয়ার্ডের বারান্দায় একটি কাচঘেরা কক্ষে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানেও শয্যার সংকুলান না হওয়ায় মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছেন শিশুরা।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে ভয় ও অসহায়ত্বের কথা জানান রোগীর স্বজনরা। তারা জানান, দ্রুত ছোঁয়াচে এ রোগের ব্যাপক বিস্তার দেখা গেলেও হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলছে না। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অনেকের।
সদর উপজেলার হারিয়াবাড়িয়া গ্রামের সুফিয়া বেগম তার ৯ মাস বয়সি নাতি মাশরাফকে কোলে নিয়ে পায়চারি করছিলেন। নাতির কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন তিনি। এসময় জানান, গত শনিবার (২৮ মার্চ) তার নাতিকে হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু এখানে ঠিকমতো ওষুধ ও চিকিৎসা মিলছে না।
উপজেলার আশুতোষপুর গ্রামের গৃহবধূ স্মৃতি খাতুন জানান, তার চার মাস বয়সি মেয়েকে গত ২৬ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। এখনও সুস্থ্য হয়নি। তিনি জানান, তার মেয়ে প্রথমে ঠান্ডা জ্বরে আক্রান্ত হয়। তারপর শরীর-মুখে লাল গুটি বের হয়। এরপর অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে, বিছানায় ঘুমাতে পারে না। এমন অবস্থায় হাসপাতালে এসে চিকিৎসকদের পরামর্শে ভর্তি করা হয়। পরে পরীক্ষা করলে হাম রোগে তার বাচ্চা আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক।
মালিগাছা গ্রামের শিমলা খাতুন জানান, তার ছেলের বয়স ৮ মাস। ঈদের পরদিন ভর্তি করা হয়েছে। সব ওষুধ বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে।
ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে এ রোগ শিশুসহ যেকোনো বয়সি মানুষের হতে পারে জানিয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. রফিকুল হাসান বলেন, আমাদের ৩৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন ভর্তি থাকে দুই শতাধিক রোগী। ফলে পর্যাপ্ত ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা হামের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ রোগের চিকিৎসায় শিশু ওয়ার্ডে আইসোলেশন ইউনিট করা হয়। পরে জরুরি বিভাগের পাশে নতুন করে আরেকটি আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে।
এদিকে জেলা শহরের জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে শিশুরা। এ ক্ষেত্রে এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কথা জানান পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই-চারজন করে হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে। এ কারণে জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৃথক আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, হামের টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়স থেকে দেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের অধিকাংশই ৯ মাসের কম বয়সি। এটি আমাদের একটু ভাবাচ্ছে। তবে আমরা সজাগ রয়েছি। পরিস্থিতি সামালে প্রস্তুতি রয়েছে।
আলমগীর হোসাইন নাবিল/এমএন/জেআইএম