মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত হেনেছে মহামারি ভাইরাস। অদৃশ্য এই জীবাণুগুলো কখনো একটি অঞ্চল, কখনো পুরো পৃথিবীকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি সত্ত্বেও নতুন নতুন ভাইরাসের আবির্ভাব মানবজাতির জন্য এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে পড়া কিছু মারাত্মক ভাইরাস মানবসভ্যতার গতিপথ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে চোখ রাঙাচ্ছে হাম। এখন পর্যন্ত সারাদেশে ৩৮ শিশু মারা গেছে হামে আক্রান্ত হয়ে। তবে শুধু হাম নয়, কয়েক বছর আগেই বিশ্ব দেখেছে করোনার মহামারির দাপট। পুরো বিশ্বে প্রায় দেড় কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এছাড়াও যুগে যুগে আরও অনেক ভাইরাস এসেছে পৃথিবীতে, বিপর্যস্ত করেছে মানুষের জীবন। আসুন কয়েকটি ভাইরাস সম্পর্কে জানা যাক-
হাম: অত্যন্ত সংক্রামক এক ভাইরাসহাম হলো একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত হাম ভাইরাস নামের একটি ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়, যা বাতাসের মাধ্যমে খুব দ্রুত এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে সহজেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম বহু শতাব্দী ধরে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। ধারণা করা হয়, প্রায় এক হাজার বছর আগে এটি মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়াতে শুরু করে। আধুনিক টিকাদান কর্মসূচি চালুর আগে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এই রোগে মারা যেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, টিকা আবিষ্কারের আগে হাম শিশু মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ ছিল। বিশ্বব্যাপী টিকা চালু হওয়ার পর হাম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবুও বর্তমানে বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এখনো এই রোগ দেখা যায়। প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ আক্রান্ত হন এবং হাজার হাজার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
গুটিবসন্ত: ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারিমানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভাইরাসগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল স্মলপক্স বা গুটিবসন্ত। ভারিওলা ভাইরাস নামের ভাইরাস থেকে এই রোগের সৃষ্টি হয়। এই রোগের লক্ষণ ছিল জ্বর, শরীরব্যথা এবং সারা শরীরে ফুসকুড়ি বা ফোস্কা। সংক্রমিতদের মধ্যে অনেকেই মারাত্মক অবস্থায় মারা যেতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, কয়েক শতাব্দী ধরে গুটিবসন্তে প্রায় ৩০ কোটির বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অসাধারণ সাফল্যের মাধ্যমে ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করে যে পৃথিবী থেকে গুটিবসন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। এটি মানব ইতিহাসে প্রথম নির্মূল হওয়া সংক্রামক রোগ।
স্প্যানিশ ফ্লু: এক শতাব্দীর ভয়াবহ মহামারি১৯১৮ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল স্প্যানিশ ফ্লু। এটি ছিল এক ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই মহামারিতে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয়, এতে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিছু গবেষণায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মহামারি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, কারণ সে সময় চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না এবং মানুষ ভাইরাস সম্পর্কে খুব কমই জানত।
এইডস: দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক সংকটবিশ্বব্যাপী আরেকটি বড় স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছিল এইচআইভি/এইডিস। এই রোগটি হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) দ্বারা ছড়ায়। ১৯৮০-এর দশকে প্রথম এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এই ভাইরাস মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩ কোটিরও বেশি মানুষ এই রোগে মারা গেছেন। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, তবুও এটি এখনো পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়।
ইবোলা: ভয়াবহ মৃত্যুহারের ভাইরাসআফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক ভাইরাসগুলোর মধ্যে অন্যতম ইবোলা। এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে। ইবোলা সংক্রমণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি কখনো কখনো ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত। আক্রান্ত রোগীদের জ্বর, রক্তক্ষরণ এবং অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো জটিলতা দেখা যায়। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা মহামারিতে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়।
করোনা: আধুনিক বিশ্বের বৈশ্বিক মহামারিসাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ভাইরাস হলো কোভিড-১৯, যা সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের কারণে সৃষ্টি হয়। ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহান শহরে প্রথম এটি শনাক্ত হয়। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালে এটিকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে। এই ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই মহামারিতে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু কেন বারবার আসে নতুন ভাইরাস? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবেশ পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ এবং বৈশ্বিক ভ্রমণ এসব কারণেই নতুন নতুন ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনেক ভাইরাস প্রথমে প্রাণীদের মধ্যে থাকলেও পরে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে শুরু করে। এছাড়া নগরায়ন, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনও নতুন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
এর থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায় প্রতিরোধ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে অনেক রোগের টিকা আবিষ্কার হয়েছে। যেমন হাম বা গুটিবসন্তের মতো রোগ টিকার মাধ্যমে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা এসবই ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
মানবসভ্যতা বহুবার ভয়াবহ ভাইরাসের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবারই বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির মাধ্যমে মানুষ সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছে। তবে নতুন ভাইরাসের ঝুঁকি কখনোই পুরোপুরি শেষ হয় না। তাই সচেতনতা, গবেষণা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতাই ভবিষ্যতে মানবজাতিকে সুরক্ষিত রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুনপরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোনিপা ভাইরাস এড়িয়ে খেজুর রস খাওয়ার উপায়
কেএসকে