টালিউড অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় মারা গেছেন। গত রোববার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দিঘার তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান ৪৩ বছর বয়সী এই অভিনেতা। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রজগতে পরিচিতি পান।
তার অকাল প্রয়াণে শোকে স্তব্ধ কলকাতার সিনেমাপাড়া। সহকর্মী-ভক্তরা চোখের জলে বিদায় দিয়েছেন রাহুলকে।
তবে তাকে নিয়ে থেমে নেই স্মৃতিচারণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুলকে নিয়েই লিখেই যাচ্ছেন তার প্রিয়জনেরা। তাদের মধ্যে আছেন অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখার্জি। দুজনের কখনো একসঙ্গে কাজ করা হয়নি। তবুও সম্পর্কটা যে বেশ জমজমাট ছিলো সেটা বোঝা যায় তার স্মৃতিচারণে।
সেখানে স্বস্তিকা লিখেছেন, ব্যক্তিজীবনে প্রতিবাদী ও লড়াকু মানুষ ছিলেন রাহুল। তার মৃত্যু হয়েছে। এবার আর কোনো কিছু নিয়েই লড়াই করতে পারবেন না তিনি। তাই সমুদ্রে ডুবে তার মৃত্যুর দায়টা কেউ নিতে চাইছে না কেউই।
স্বস্তিকা তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘মনে না করতে চাইলেও ফেসবুক মনে করিয়েই দেয়। অন্য সময় হলে এক গাল হেসে ছবিটা তোকে পাঠাতাম। কত স্মৃতি। কপাল দেখ, শত ইচ্ছে থাকলেও একসঙ্গে আর কাজ করা হলো না।’
রাহুল ‘সহজ কথা’ নামের একটা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। সেখানে হাজির হতেন তারকারা। কথা ছিলো সম্প্রতি নিজের শুটিং করে ফিরলে পরের পর্বে অতিথি হবেন স্বস্তিকা। সেটাও আর হলো না রাহুলের মৃত্যুতে। সেই আক্ষেপ করে প্রকাশ করে স্বস্তিকা লেখেন, ‘তোর সঙ্গে শেষ কথা কয়েক সপ্তাহ আগে, আমি অরুণাচল যাচ্ছিলাম, ফিরে এসে ‘সহজ কথা’য় যাব। তুই এর মধ্যে ‘বিবি পায়রা’ ছবিটা দেখে নিবি, সেই নিয়ে গল্প হবে আরও কত কিছু। তুই এর আগেও কয়েকবার ফোন করেছিলি, অন্য বিষয়ে, গজগজ করতে যখন ফোন করতিস সেগুলোই ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের। আমি প্রত্যেকবার অন্য শহরে ছিলাম, ফিরে এসে ‘সহজ কথা’য় যাবো, তারপর তোর -আমার কাজের ব্যস্ততা সামলে যাওয়ার তারিখ, পেছতেই থাকল। কিন্তু এইবারটা তো পাকাপাকি হয়ে গেছিলো ভাই। তুইও আউটডোর থেকে ফিরবি, আমিও, তারপর জমিয়ে আড্ডা হবে। জীবন নিয়ে, যাপন নিয়ে, কাজ নিয়ে, এমনি - কিছু না নিয়েও।’
রাহুলের মৃত্যুর খবরটা স্বস্তিকার জীবনে আফসোসের বৃষ্টি নামিয়েছে। তিনি লেখেন, ‘খবরটা পেয়ে অব্দি বারবার একই কথা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, বারংবার মেয়েকে বলছি, বড্ড দেরি হয়ে গেল। আর তো কোনদিন কথা হবেনা, দেখা হবে না, কাজ করা হবে না। আজকাল সবই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে ভাই, তুই একটা সোজা শিরদাঁরা নিয়ে মহাপ্রস্থানে গেলি এটাই শিক্ষনীয়, বিষ্ময়করও বটে। লোকে একটা আস্ত মেরুদণ্ড নিয়ে হাঁটতে চলতে পারছে না, তুই কিনা সগ্গে চলে গেলি! তোর মৃত্যু অনেক কিছু শিখিয়ে গেল, জীবনের কিছু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহস যোগালো। কাজ পাই, না পাই, সেগুলোতে অনড় থাকব, থাকবই।’
তিনি আরও লেখেন, ‘অরুণোদয় - এইভাবে অস্ত না গেলেও পারতিস। আহা গো। যার গেল তার গেল। বাবা সর্বক্ষণ বলতো, আমাদের প্রফেশন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি রুথলেস। কেউ কারোর নয়, কারোর দায় নেই, কিছু হলে কেউ দায়িত্ব নেবে না, নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। তোর চলে যাওয়ার দায় দেখ কেউ নিলো না, তোর ওপরেই দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তুই তো আর নিজের হয়ে লড়তে পারবিনা, এটাই ওদের কাছে তুরুপের তাস। মায়া নেই, দুঃখ নেই, আহা নেই, দায়বদ্ধতা নেই, কাজের নিয়ম নিয়ে কৈফিয়ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, আসলে বোধটাই নেই। আমরা সবাই রিপ্লেসেবল। তোর চলে যাওয়া বাবার বলে যাওয়া কথাগুলোয়ে শীল মোহর বসালো।’
মেয়ে ও রাহুলের সঙ্গে ছবি পোস্ট করে সেটি প্রসঙ্গে স্বস্তিকা লেখেন, ‘এই ছবিটা আমাদের একসঙ্গে করা একটা কাজ- ‘টেক ওয়ান’র। সালটা বোধ করি ২০১৪। মনে আছে। কারণ মা তার পরের বছর একই সময়ে চলে গেছিল। জীবনময় শুধু তারিখ। মানি এই একটাই কাজ আমার সঙ্গে করেছিলো বলে এতকাল এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিলো। এবার থেকে এক পাহাড় সমান বিষাদের কারণ হয়ে তুই যোগ দিলি। মার্চ মাসটার তাৎপর্যটাই বদলে গেল। ১১ তারিখ বাবা, ২৯ তারিখ তুই। এভাবে তুই ও আরেকটা তারিখ হয়ে যাবি স্বপ্নেও ভাবিনি। অবশ্য তুই বলেছিলি, জন্মদিনের মতন আমাদের মৃত্যুদিন টাও বছরের কোনও একটা দিনেই লুকিয়ে আছে, হঠাৎ করে ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে গোল হয়ে সে বিশেষ পদে উত্তীর্ণ হবে। তুই পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে আকাশে মিশে গেলি, আমি এখনও মেনে নেওয়ার যুদ্ধ চালাচ্ছি। সময় লাগবে। অনেকটা সময় লাগবে। সহজ হবেনারে।’
‘বন্ধু আমার, বিদায়’ জানিয়ে শেষবেলায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কিছু পঙতি লিখে স্বস্তিকা ভালোবাসা জানান বন্ধু রাহুলকে। তিনি লেখেন, ‘যাওরে অনন্তধামে মোহ মায়া পাশরি / দুঃখ আঁধার যেথা কিছুই নাহি / জরা নাহি, মরণ নাহি, শোক নাহি যে লোকে / কেবলই আনন্দস্রোত চলিছে প্রবাহি!’
এলআইএ