অফিসে আপনি নিয়মিত সময়মতো আসেন, দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কাজ করেন, সহকর্মীদের সহযোগিতা করেন, তবুও যখন প্রাপ্য সম্মান বা স্বীকৃতি আসে না, তখন হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
অনেকেই মনে করেন, ‘আমি তো সবই করছি, তাহলে সমস্যা কোথায়?’ বাস্তবতা হলো, শুধু বেশি কাজ করলেই সব সময় মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। এর পেছনে থাকে কিছু বাস্তবতা, অফিস রাজনীতি, মানসিক এবং কৌশলগত কারণ।
ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়ার ওয়ার্টন স্কুলের একজন প্রখ্যাত সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানী অ্যাডাম গ্রান্ট তার বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘অতিরিক্ত সহায়ক কর্মীরা অনেক সময় নিজেরাই অবমূল্যায়িত হয়ে পড়েন।’
কাজের পরিমাণ নয়, প্রভাবটাই গুরুত্বপূর্ণঅনেকেই মনে করেন, যত বেশি কাজ করবেন, তত বেশি মূল্যায়ন পাবেন। কিন্তু করপোরেট দুনিয়ায় শুধু কাজের পরিমাণ নয়, কাজের প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়।আপনি হয়তো সারাদিন ব্যস্ত, কিন্তু আপনার কাজটি প্রতিষ্ঠানকে কতটা এগিয়ে নিচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
অনেকেই চুপচাপ কাজ করে যান, ভাবেন ‘ভালো কাজ করলে বস নিজেই বুঝবেন।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, বস অনেক সময় দেখেও এড়িয়ে যান, অথবা ব্যস্ত অফিসে সব কাজ নজরে পড়ে না। আপনি যদি আপনার অর্জন, অবদান বা সাফল্য তুলে না ধরেন, তাহলে সেটি অদৃশ্যই থেকে যেতে পারে।
যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতিকেবল কাজ ভালো করলেই হয় না, সেটি কীভাবে উপস্থাপন করছেন তাও গুরুত্বপূর্ণ। যাদের যোগাযোগ দক্ষতা ভালো, তারা একই কাজ করেও বেশি স্বীকৃতি পান। স্পষ্টভাবে কথা বলা, নিজের আইডিয়া বোঝানো, মিটিংয়ে অংশ নেওয়া এসবই মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে।
‘সবসময় হ্যাঁ’ বলার অভ্যাসঅন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে বা ভালো কর্মী প্রমাণ করতে গিয়ে অনেকেই সব কাজেই ‘হ্যাঁ’ বলে দেন। ফলে কী হয়?
নিজের মূল কাজের গুরুত্ব কমে যায় আপনি ‘সবসময় পাওয়া যায়’ এমন একজন হয়ে যান আপনার অতিরিক্ত কাজকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় সঠিক নেটওয়ার্ক না থাকাঅফিস রাজনীতিকে অনেকেই অপছন্দ করেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো সম্পর্ক ও নেটওয়ার্কিং মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখে। যারা ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তাদের কাজ সহজে চোখে পড়ে।
সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি হয়তো এমন কাজেই বেশি সময় দিচ্ছেন, যেগুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে আপনি ব্যস্ত থাকলেও ‘স্ট্র্যাটেজিক ভ্যালু’ তৈরি করতে পারছেন না।
নিজের সীমা নির্ধারণ না করাআপনি যদি সব সময় অতিরিক্ত কাজ করেন, অফিস সেটিকে আপনার ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে ধরে নেয়। তখন আর সেটি আলাদা করে মূল্যায়ন পায় না।
নেতৃত্বের নজরে না থাকাকিছু প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন অনেকটাই নির্ভর করে কে আপনাকে দেখছে তার ওপর। আপনার কাজ যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের নজরে না আসে, তাহলে স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
আত্মবিশ্বাসের অভাবঅনেক দক্ষ কর্মী আছেন, যারা নিজের কাজের মূল্য নিজেই বুঝতে পারেন না। ফলে-
তারা নিজের প্রাপ্য দাবি করেন না বেতন বা পদোন্নতির সময় চুপ থাকেন অন্যরা তাদের কাজের কৃতিত্ব নিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি সমস্যাসমস্যা আপনার না-ও হতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠানে-
কাজের সঠিক মূল্যায়ন হয় না পক্ষপাতিত্ব থাকে স্বচ্ছতা কম থাকেএই ধরনের জায়গায় আপনি যতই কাজ করুন, প্রাপ্য স্বীকৃতি পাওয়া কঠিন।
কী করবেন? নিজের কাজের ফলাফল নিয়মিত রিপোর্ট করুন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেছে নিয়ে তাতে ফোকাস করুন যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করুন প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে শিখুন নিজের অর্জন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরুন ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে পেশাদার সম্পর্ক গড়ে তুলুন দীর্ঘদিনেও পরিবর্তন না এলে নতুন সুযোগ ভাবুনবেশি কাজ করলেই যে বেশি মূল্যায়ন পাওয়া যাবে, এই ধারণা সব সময় সত্য নয়। সঠিক কৌশল, যোগাযোগ এবং নিজের কাজের প্রভাব তুলে ধরার দক্ষতা এই তিনটির সমন্বয়ই আপনাকে প্রাপ্য সম্মান এনে দিতে পারে। আপনি যদি শুধু পরিশ্রম না করে স্মার্টভাবে কাজ করা শুরু করেন, তাহলে হয়তো দেখবেন অধরা স্বীকৃতিটাই ধীরে ধীরে আপনার নাগালে চলে আসছে।
তথ্যসূত্র: গ্যালাপ, ওয়ান্ডার মাইন্ড
জেএস/