জাতীয়

জ্বালানি সংকটে ঢাকার সড়কে কমেছে গণপরিবহন, নাগরিক ভোগান্তি চরমে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্বই জ্বালানি নিয়ে বিপাকে পড়েছে। প্রভাব এসে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতেও। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় রাজধানীসহ সারা দেশের তেলের পাম্পগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে, আবার যেগুলো খোলা আছে সেগুলো থেকে জ্বালানি নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিভিন্ন যানের চালকদের।

প্রায় এক মাস ধরে চলা এই অচলাবস্থার বিরূপ প্রভাব এসে পড়েছে রাজধানীর সড়কে। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না পেয়ে অর্ধেক গণপরিবহন সড়কে নামিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিকরা। এতে চলাচলকারী সীমিত সংখ্যক গণপরিবহনের ওপর চাপ বেড়েছে যাত্রীর। বিশেষ করে অফিসের শুরু ও শেষ সময়ে যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় মিলছে না। আবার বাস পেলেও আসনের কয়েকগুণ বেশি যাত্রী ওঠায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

বাস আসলেই কার আগে কে উঠবে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা/ছবি: জাগো নিউজ

বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে ও পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

‘আমাদের মাত্র ২০ লিটার করে তেল দিচ্ছে। আগে প্রতিদিন আমাদের ৩৫০টির মতো গাড়ি বের হতো। এখন তেলের সংকটের কারণে রাস্তায় গাড়ি বের হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০টার মতো। আগে আমরা দিনে ছয় ট্রিপ করে ভাড়া মারতে পারতাম। এখন সারাদিনে একটা ট্রিপ মারতে পারি।’ —আশিক, সাভার পরিবহনের চালকের সহকারী

স্টপেজে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাস অফিসের শেষ সময়ে বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বাসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। ফলে ঘরমুখী মানুষজনকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। স্টপেজগুলোতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও দেখা মিলছিল না কাঙ্ক্ষিত বাসের। যে বাসগুলো চলছিল সেগুলো ছিল যাত্রীতে ঠাসা। ফলে নতুন করে যাত্রী ওঠার কোনো সুযোগই মিলছে না। এর মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে অনেককেই বাসের গেটে ঝুলে গন্তব্যে রওনা দিতে দেখা যায়।

আরও পড়ুনইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়া প্রথম দেশ হতে পারে বাংলাদেশজ্বালানি তেলের সংকট, যেসব গাড়ি কমাতে পারে খরচজরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ৩ লাখ টন ডিজেল কেনার নীতিগত অনুমোদনজ্বালানি সংকটে বিপাকে মোটরসাইকেল মেকানিকরা, স্থবির পার্টস ব্যবসা

পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় কমেছে বাস ও ট্রিপের সংখ্যা সাভার পরিবহনের চালকের সহকারী আশিক বলেন, ‘আমাদের মাত্র ২০ লিটার করে তেল দিচ্ছে। আগে প্রতিদিন আমাদের ৩৫০টির মতো গাড়ি বের হতো। এখন তেলের সংকটের কারণে রাস্তায় গাড়ি বের হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০টার মতো। আগে আমরা দিনে ছয় ট্রিপ করে ভাড়া মারতে পারতাম। এখন সারাদিনে একটা ট্রিপ মারতে পারি।’

বাসের গেটে ঝুলেই গন্তব্যে যেতে দেখা যায় অনেককেই/ছবি: জাগো নিউজ

লাব্বাইক পরিবহনের চালকের সহকারী রবিন বলেন, পাম্পে গেলে বলে তেল নেই। তাহলে গাড়ি চলাচলে তেলের প্রভাব পড়বে না ভাই? তেলের কারণে মালিক সব গাড়ি রাস্তায় বেরও করতে পারছে না। ঠিকঠাক ভাড়াও মারতে পারছি না।

‘তেল সংকটের পর থেকেই চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে। আগেতো বাসের গেটে বা ভেতরে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করা যেতো। আর এখন যে কয়টা গাড়ি চলছে সেগুলোর গেটেও দাঁড়ানোর পরিবেশ নেই। তেলের সমস্যার কারণে রাস্তায় গাড়ি কমেছে, চলাচলে ঝামেলা বেড়েছে মানুষের।’—শিকদার আকাশ, বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা যাত্রী

ঠিকানা পরিবহনের চালকের সহকারী সামিউল আলম সবুজ বলেন, পাম্পে তেল আনতে গেলে প্রথমত সিরিয়ালে থাকতে হচ্ছে। দ্বিতীয় কথা সিরিয়ালে সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল পাচ্ছি না। এ জন্য আমরা ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারছি না। আমাদের প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, তেলের সংকটের কারণে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কমে গেছে। আগে আমাদের যতগুলো গাড়ি বের হতো, এখন তার অর্ধেক গাড়ি রাস্তায় বের হচ্ছে।

ওয়েলকাম পরিবহনের চালকের সহকারী আনোয়ার বলেন, তেল সংকটের কারণে সড়কে গাড়ির সংখ্যা অনেক কমেছে। আগে প্রতিদিন আমাদের ৬০ থেকে ৭০টা গাড়ি চলতো। আর এখন ৪০-৪৫টা গাড়ি চলাচল করছে।

গাবতলী লিংক (৮ নম্বর) বাসের চালকের সহকারী সাগর বলেন, তেলের ঝামেলায় রাস্তায় অনেক গাড়ি কমে গেছে। অফিস সময়ে রাস্তায় গাড়ির অনেক ভিড় থাকে কিন্তু এখন গাড়ি কম।

আমরা লক্ষ্য করেছি, জ্বালানি সংকটের পর থেকে ব্যক্তিগত পরিবহনের চলাচল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। আর গণপরিবহনের সংখ্যা ২০-২৫ শতাংশ কমে গেছে। গাড়ির সংখ্যা কমার ফলে রাস্তায় চলাচলে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।—মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী,মহাসচিব, যাত্রী কল্যাণ সমিতি

অফিসের শুরু এবং শেষ সময়ে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অফিস শেষ আর শুরুর টাইমে যাত্রীর অনেক চাপ হচ্ছে। কিন্তু তেল সংকটের কারণে অনেক গাড়ি বের না হওয়ায় রাস্তায় যানবাহন কমে গেছে।

অফিসের শুরু ও শেষ সময়ে যাত্রীর চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি/ছবি: জাগো নিউজ

সাগর আরও বলেন বলেন, ‘আগে আমাদের কোম্পানির ২০০টির মতো গাড়ি চলতো। আর এখন ১০০টা, হাইস্ট গেলে (বেশি হলে) ১২০টা গাড়ি চলছে। কালকে গাড়িতে তেল দেয় নাই। পরে আজ খুব করে বলার কারণে মাত্র ২০ লিটার তেল দিছে।’

গণপরিবহন সংকটে নগরবাসীর সীমাহীন ভোগান্তিএদিকে, প্রয়োজনের তুলনায় সড়কে গণপরিবহন কম চলাচলের কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাসের জন্য। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে রিকশা বা অটোরিকশায় যাতায়াত করতে দেখা গেছে অনেককেই।

আরও পড়ুন

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট, দেশে দেশে নানা পদক্ষেপজ্বালানি তেলের সংকট: ছোট যাত্রায় কী ধরনের গাড়ি-বাইক ব্যবহার করবেন১৫০০ থেকে ৩০০ টাকায় নেমেছে মোটরসাইকেল চালকদের আয়

অফিস শেষ করে গাড়ির অপেক্ষায় রাজধানীর শ্যামলী বাস পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিকদার আকাশ। কথা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘তেল সংকটের পর থেকেই চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে। আগেতো বাসের গেটে বা ভেতরে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করা যেতো। আর এখন যে কয়টা গাড়ি চলছে সেগুলোর গেটেও দাঁড়ানোর পরিবেশ নেই। তেলের সমস্যার কারণে রাস্তায় গাড়ি কমেছে, চলাচলে ঝামেলা বেড়েছে মানুষের।’

লাইজুল ইসলাম নামের অপর এক যাত্রী বলেন, ‘ভোগান্তির কথা আর কি বলবো ভাই। আমরা ঢাকায় মধ্যবিত্ত যারা বসবাস করি—তাদের না আছে নিজের গাড়ি, না আছে টাকার জোর। তাই যত ভোগান্তিই হোক গণপরিবহনই আমাদের একমাত্র ভরসা। তেলের সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকে আগের তুলনায় যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়েছে। কিন্তু আমাদের সহ্য হয়ে গেছে, সব মানিয়ে নিয়েছি।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরাযাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, জ্বালানি সংকটের পর থেকে ব্যক্তিগত পরিবহনের চলাচল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। আর গণপরিবহনের সংখ্যা ২০-২৫ শতাংশ কমে গেছে। গাড়ির সংখ্যা কমার ফলে রাস্তায় চলাচলে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

বাস স্টপেজগুলোতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাসের দেখা/ছবি: জাগো নিউজ

পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের জন্য গণপরিবহন ফ্রি করে দেওয়ার উদাহরণ টেনে মোজাম্মেল হক আরও বলেন, এমন উদ্যোগের ফলে ব্যক্তিগত পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, সবাই গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত পরিবহন না চলার কারণে জ্বালানির চাহিদা কমে যায়। একজন মানুষ একটি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামলে যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, একটি গণপরিবহন ৫০ জন মানুষ বহন করে নিয়ে গেলেও একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার এ ধরনের নীতিগুলো অনুসরণ করতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

কেআর/এমএমকে