বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট, দেশে দেশে নানা পদক্ষেপ
ইরান যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে দেশগুলো নাগরিকদের ধীরে গাড়ি চালাতে, বাসা থেকে কাজ করতে এবং অপ্রয়োজনীয় পোশাক ত্যাগ করতে বলছে। আবার জ্বালানির মজুত কমে যাওয়া এবং দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক দেশ কয়লা ব্যবহার বাড়াচ্ছে, জ্বালানি রেশনিং চালু করছে, কর্মসপ্তাহ কমিয়ে দিচ্ছে ও মানুষকে ঘরে থাকতে উৎসাহিত করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহ কমে গেছে। এই ঘাটতির কারণে সরকারগুলো জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যাতে বাড়তে থাকা খরচ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা ইতোমধ্যে অর্থনীতিগুলোকে অস্থির করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সদস্য দেশগুলো গত মাসে কৌশলগত মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার মাধ্যমে বাজারকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে। সংস্থাটি কম উড়োজাহাজে ভ্রমণ করা ও ধীরে গাড়ি চালানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের তেল সংকট গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো-
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র, যা ইসরায়েলের সঙ্গে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলা চালায়, ইরানের তেল অবকাঠামোর ওপর আরও হামলার হুমকি দিয়েছে। এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলো, যারা এই অভিযানে যোগ দেয়নি, তাদের সমালোচনা করে বলেন, আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনে নিতে ও এরপর উপসাগর অঞ্চল থেকে নিজেদের তেল সংগ্রহ করতে।
ফেডারেল সরকার এখনো ভর্তুকি বাড়ানো বা বিল পরিশোধে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা দেয়নি। তবে তারা জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর নীতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো আটকে দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে ফরাসি কোম্পানি টোটাল এনার্জিসকে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হবে এবং সেই বিনিয়োগ তেল ও গ্যাস খাতে সরিয়ে নেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডা
যুক্তরাজ্য জ্বালানির দাম বাড়লেও জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং চাহিদা কমানোর কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। তারা শুধু গরমের জন্য তেল ব্যবহারকারীদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
দেশটির অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস আর্থিক সংকটে থাকা দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য কাউন্সিল পরিচালিত তহবিলে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন। তবে আগের জ্বালানি সংকটের মতো সার্বজনীন সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করেছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সরকারগুলোকে সতর্ক করেছে যেন তারা সবখাতে ভর্তুকি না দিয়ে প্রয়োজনীয় মানুষদের লক্ষ্য করে সহায়তা দেয়।
নিউজিল্যান্ড প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবারকে সাপ্তাহিক নগদ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা জ্বালানি সহায়তা প্যাকেজের অংশ।
অস্ট্রেলিয়া তিন মাসের জন্য জ্বালানি কর ৫০ শতাংশ কমিয়েছে এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তারা চালকদের শুধু প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে বলছে এবং স্বেচ্ছা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধির প্রভাব কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, কানাডা এখনো মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পরিচ্ছন্ন অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছে, যদিও কিছু সদস্য দেশ এতে ধীরগতি দেখাচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইতালি কয়লা ব্যবহার বন্ধের পরিকল্পনা এক দশকের বেশি সময় পিছিয়েছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আরও দীর্ঘ সময় চালু রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দ্রুততর করার কথা বলেছেন।
ইউরোপের কয়েকটি সরকার জ্বালানি ভর্তুকি ও করছাড় ঘোষণা করেছে, যাতে ভোক্তারা মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে পারে।
বুধবার ইউরোপীয় কমিশন কার্বনমূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে অতিরিক্ত অনুমতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল না হয়। পাশাপাশি তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বিদ্যুতের ওপর কর জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম রাখা হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে এবং পেট্রোলচালিত গাড়ি ও গ্যাসচালিত যন্ত্র থেকে সরে আসা দ্রুত হয়।
ইইউ’র জ্বালানি কমিশনার ড্যান জরগেনসেন সদস্য দেশগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। অধিকাংশ দেশ চাহিদা কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক হলেও স্লোভেনিয়া পাম্পে জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে ও লিথুয়ানিয়া আগামী দুই মাসের জন্য অভ্যন্তরীণ ট্রেনের ভাড়া অর্ধেকে নামিয়েছে।
এশিয়া
জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এশিয়ায় আবারও কয়লার ব্যবহার বাড়ছে। ভারত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। জাপান কম দক্ষ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার চালুর অনুমতি দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমা তুলে নিয়েছে এবং তা বন্ধ করার পরিকল্পনা পিছিয়েছে। বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি জীবাশ্ম, পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে জ্বালানি উৎপাদন বাড়িয়েছে ও বড় কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তুলেছে।
রাষ্ট্র পরিচালিত পরিশোধনাগারগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কায় ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি এড়িয়ে চললেও, স্বাধীন ছোট পরিশোধনাগারগুলো অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য তা প্রক্রিয়াজাত করছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানির চাহিদা কমাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা জ্বালানি রেশনিং ও চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।
ভিয়েতনাম নিয়োগদাতাদের কর্মীদের বাসা থেকে কাজের সুযোগ দিতে বলেছে। থাইল্যান্ডে সংবাদ উপস্থাপকরা সম্প্রচারের সময় জ্যাকেট খুলে ফেলেছেন। সরকার জনগণকে কম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করতে বলেছে এবং কর্মকর্তাদের টাই ছাড়া স্বল্পহাতা জামা পরতে নির্দেশ দিয়েছে।
এছাড়া সরকারি দপ্তরে তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কম গাড়ি চালানো, বেশি গণপরিবহন ব্যবহার ও যৌথভাবে গাড়ি ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আফ্রিকা
আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ পরিশোধিত তেলের আমদানিনির্ভর। কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সারমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেও তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে হয়েছে।
কিছু দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। মঙ্গলবার দক্ষিণ আফ্রিকা এক মাসের জন্য জ্বালানি শুল্ক কমিয়েছে।
তানজানিয়া জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে কৌশলগত মজুত বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে এবং দার এস সালামে নতুন মূল্যসীমা নির্ধারণ করেছে।
ইথিওপিয়া বিশেষ জ্বালানি ভর্তুকি চালু করেছে এবং জিম্বাবুয়ে জ্বালানির সঙ্গে ইথানল মেশানোর পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
দক্ষিণ সুদান রাজধানী জুবায় বিদ্যুৎ রেশনিং শুরু করেছে এবং মরিশাস অপ্রয়োজনীয় কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করেছে।
দক্ষিণ আমেরিকা
দক্ষিণ আমেরিকায়, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানির ইতিহাস রয়েছে, অনেক সরকার মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করছে না।
চিলির নতুন প্রেসিডেন্ট হসে অ্যান্তোনিও কাস্ত দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বাড়িয়েছেন। তবে জনদুর্ভোগ কমাতে গণপরিবহনের ভাড়া বছরজুড়ে অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
বুধবার আর্জেন্টিনা তরল জ্বালানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের ওপর নির্ধারিত কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। এর কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ের মিলেইয়ের সরকার স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে স্বেচ্ছায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ইথানল মেশানোর অনুমতি দেওয়ার কথা জানায়।
অন্যদিকে, ব্রাজিল তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ সেখানে এমন যানবাহন রয়েছে যা ইথানল ও পেট্রোল উভয় দিয়েই চলতে পারে। ফলে চালকরা আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে দেশীয় আখ থেকে উৎপাদিত ইথানল ব্যবহার করতে পারছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএএইচ