প্রযুক্তির এই যুগে আমরা গ্রাম-বাংলার অনেক ঐতিহ্য হারিয়েছি। হারিয়েছি পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রে ব্যবহৃত অতি-অপরিহার্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছু, যা ছিল একেবারেই মানুষের অতীব প্রয়োজনীয় জিনিস। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা আর নিত্যনতুন আবিষ্কারের ফলে এসব প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে এরইমধ্যে বিদায় নিয়েছে ঢেঁকি, পালকি থেকে শুরু করে লাঙ্গল, জোয়াল, মইসহ অনেক কিছু। আবার অনেক সামগ্রী বিদায়ের প্রহর গুনছে। হয়তো এরইমধ্যে তারা বিলুপ্ত হবে খুব নীরবে এবং নিঃশব্দে।
বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার এদের স্থান দখল নিয়েছে বেশ দাপটের সঙ্গে। এক সময়ের দুর্দান্ত দাপট নিয়ে চলা এসব সামগ্রী বর্তমান এবং আগামী প্রজন্ম তার শিশুসন্তানদের কিচ্ছা-কাহিনিতে ব্যবহার করে ঘুমের সংগীত শুনাবে সন্দেহ নেই। অথবা বার্ষিক ক্যালেন্ডারের ছবি করে এসব জিনিসের হারানো গৌরবময় ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করবে।
তবে এ কথা শতভাগ আস্থার সঙ্গে বলা যায় যে, কালের বিবর্তনে যারাই হারিয়ে যাচ্ছে বা গেছে তারা যে এ নবযুগে আবার তাদের হারানো জৌলুস নিয়ে সগৌরবে ফিরে আসবে, সেটা অসার কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। তবে আমরা আশা করতে পারি অথবা দাবি জানাতে পারি, হারিয়ে যাওয়া এসব সামগ্রী চার দেয়ালে আবদ্ধ কোনো এক জাদুঘর কক্ষে রেখে তার নিজের অতীত মহিমা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ যেন করে দেওয়া হয়।
গ্রামবাংলা তথা মানুষের অতি-পরিচিত এবং শতভাগ প্রয়োজনীয় জিনিস হারিকেন ও কুপিবাতি। ভিন্ন খানে ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও হারিকেন ও কুপিবাতি নামেই ওরা সবার কাছে পরিচিত। যা অতীতে আমাদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। চিরচেনা এ গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী দেশের প্রত্যন্ত কোনো এক অঞ্চলে দেখা গেলেও আজ সেটা প্রায় বিলপ্তির পথে।
হারিকেন হলো কেরোসিন তেলের মাধ্যমে বদ্ধ এক কাচের পাত্রে ঢাকা আলো জ্বালানোর এক সুব্যবস্থা। যার বাইরের অংশ হালকা কাচের আবরণ দিয়ে মোড়ানো থাকে, যার কোনোটা লম্বাটে আবার কোনোটা মধ্যম চ্যাপ্টা গোলাকার। যাকে আমরা চিমনি বলে থাকি। চিমচির ভেতরের অংশে থাকে একটা ছোট ছিপি এবং ছিপির মাঝে থাকে আলো জ্বালানোর জন্য এক টুকরো কাপড়। ছিপির মধ্যে সে কাপড়ের টুকরা ঢুকিয়ে একটি ছোট গিয়ারের মাধ্যমে ওঠা-নামা করানো যায় এবং আলো কমানো বা বাড়ানোর কাজ হয়ে থাকে। হারিকেনের নিচের অংশে থাকে তেল ধারণ করার জন্য ছোট্ট একটা ট্যাংকি। সে ট্যাংকির তেল কাপড়ের টুকরো শোষণ করে আলো বিলিয়ে দেয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে এবং কাপড়ের টুকরোর মাথায় অগ্নি সংযোগের ফলে সে আলো দিয়ে থাকে। হারিকেনকে বহন করার জন্য তার বাইরের অংশে থাকে একটি লোহার ধরুনি। যেটা ধরে আমরা হারিকেনকে অতি সহজে বহন করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অনায়াসে নিয়ে যেতে পারি।
কুপিবাতি বা ল্যাম্পের আকার একটু ভিন্ন ধরনের। বিভিন্ন অঞ্চলে কুপিবাতিকে অনেকে আবার ‘ল্যাম্প’ বলেও ডাকে। এই ল্যাম্প বা কুপিবাতির আকার অনেকটা গোলাকার ছোট ও চ্যাপ্টা। কাচের ঔষধের ছোট্ট শিশি দিয়ে কুপিবাতি বা ল্যাম্প তৈরি করা যায়। কিন্তু পিতল ও সিলভারের তৈরি কুপিবাতি দেখতে ছিল খুবই সুন্দর ও শৈল্পিক। পিতল ও সিলভারের তৈরি ভিন্ন ডিজাইনের এসব কুপিবাতি হাটবাজারে পাওয়া যেত অহরহ।
হারিকেন ও কুপিবাতির ব্যবহারএক সময় রাতের আঁধার থেকে ফকফকা আলোতে নিজেকে আবিষ্কার করতে হারিকেন ছাড়া বিকল্প আর কোনো ব্যবস্থা ছিলই না। মানুষ হারিকেনের ওপর ভর করেই তার রাতের যাবতীয় কাজ সমাধা করতো। তাই তাকে রাতের বন্ধু, নিশি বেলার সাথী, আলোর পথ-প্রদর্শক, লণ্ঠন, গৃহমশাল, ঘরের আলো, প্রদীপ বাতি, কেরোসিন বাতি ইত্যাদি নামে ডাকা হতো। গ্রামের বাড়িতে হারিকেন ছিল না এমন কথা ভাবাই যেত না। হারিকেনের পাশাপাশি কুপিবাতি নামেও এক প্রকার বাতির প্রচলন ছিল গ্রামে, যা আলো দিতে সাহায্য করতো। ঠিক কখন থেকে হারিকেন বা কুপিবাতির প্রচলন হয় তা সঠিকভাবে বলা না গেলেও ধারণা করা যায় মোগল আমলের অনেক আগে থেকে বাংলায় এর প্রচলন শুরু হয় এবং অদ্যাবধি বাংলাদেশের অনেক এলাকায় তার ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
এক সময় হারিকেনের আলো ব্যবহার করে ট্রেন চলাচল করতো। প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশনে হারিকেন থাকা ছিল অপরিহার্য। হারিকেনের আলো রেলের সিগন্যাল হিসেবে কাজ করতো। তাছাড়া এই হারিকেন হাতে নিয়ে আমাদের ‘রানার’ ছুটত গ্রাম থেকে গ্রামে। দূর থেকে দূরান্তে। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা আজ শুধুই স্মৃতি। বেশি দিন দূরের কথা নয়, এখন থেকে প্রায় ২ দশক আগেও বেশির ভাগ ঘরেই ব্যবহার হতো হারিকেনসহ বিভিন্ন ধরনের কুপিবাতি। কিন্তু আজ দুই দশক পরে এসে সেই দৃশ্য পুরোটাই পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে হারিকেন বা কুপিবাতির উপস্থিতি আমাদের প্রজন্মের কাছে হাস্যরসের সৃষ্টি করে।
কিন্তু মাত্র দুই দশক আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সন্ধ্যা আসার আগেই ঘরের ঝি-বউরা ব্যস্ত হয়ে পড়তো সন্ধ্যায় ঘরে আলো জ্বালানোর জন্য। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় আলো কমিয়ে জ্বালিয়ে রাখা হতো। ঠিক একইভাবে কুপিবাতিকেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে প্রস্তুত করা হতো। কুপিবাতির প্রকারভেদ ছিল কয়েক ধরনের। প্রতিটি পরিবারে বা ঘরে এদের পরিচয়ও ছিল ভিন্ন নামে ভিন্নভাবে। যেমন-একনলা কুপিবাতি, দুইনলা কুপিবাতি, একতাক কুপিবাতি, দুইতাক কুপিবাতি ইত্যাদি। পিতল ও সিলভারের তৈরি কুপিবাতির ব্যবহারই ছিল সবচেয়ে বেশি।
মানুষের সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সুতরাং বিজ্ঞানের এ যুগে বাংলার ঐতিহ্য হারিকেন আর কুপিবাতি যে ধোপে টিকবে না তা যৌক্তিক বাস্তবতা। এটা আমাদের যে কোনভাবে মেনে নিতেই হবে। তাই বলে আমরা আমাদের ঐতিহ্য হেলায় ফেলে দেবো? তা কিন্তু নয়। আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে যত্ন সহকারে লালন করবো। সংরক্ষণ করবো। নতুন প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য জানবে, শুনবে এবং দেখবে।
আরও পড়ুননারীর সঙ্গে পরিবেশ, পরিবেশের সঙ্গে উন্নয়নপহেলা বৈশাখ ঘিরে কর্মব্যস্ত কুমারপাড়াকেএসকে