আন্তর্জাতিক

‘চাটুকারিতা’ দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে বশ করেছে পাকিস্তান?

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ঘিরে কয়েকদিন ধরে যে টানটান উত্তেজনা চলছিল, তা মঙ্গলবার গভীর রাতে হঠাৎ করেই থেমে যায়। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতে শান্তির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় চলে আসে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের সহায়তায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতির পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করে। টানা ৪০ দিনের এই যুদ্ধে বিভিন্ন দেশে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ইরানে ১ হাজার ৬০০’র বেশি বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

যদিও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা প্রথম দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার প্রায় ৯০ মিনিট পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননেও প্রযোজ্য এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য মুখোমুখি আলোচনা ইসলামাবাদে শুরু হতে পারে।

‘সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য’

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যকে বিপর্যয়ের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানের এই ভূমিকা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়া বলেন, ‘বিপজ্জনক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য একটি বের হওয়ার পথ তৈরি করতে পাকিস্তানের ভূমিকা গঠনমূলক ছিল এবং ভারতসহ সারা বিশ্বেরই একে স্বাগত জানানো উচিত।’

আরও পড়ুন>>ইরান: বিশ্বের বুকে নতুন পরাশক্তির উত্থান?পাকিস্তান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ থামালোযুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান নয়, আসল খেলোয়াড় অন্য কেউ: ভারতীয় মিডিয়া

তবে ধারণা করা হয়, পাকিস্তান একমাত্র মধ্যস্থতাকারী ছিল না। ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন নীরবে যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছে।

পাকিস্তানের এই ভূমিকার পেছনে নিজস্ব স্বার্থও কাজ করেছে। দেশটি জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং যুদ্ধের কারণে তেল-গ্যাস সংকটের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোতে বিঘ্ন ঘটেছে।

তবুও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধবিরতি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান একে পাকিস্তানের জন্য ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, ‘অনেকেই সন্দেহ করেছিল যে পাকিস্তান এত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা ইরানে সম্ভাব্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে।’

ট্রাম্প-মুনির সম্পর্ক ও পাকিস্তানের ‘চাটুকারিতা’

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক স্বরণ সিং বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প তাকে ‘দারুণ যোদ্ধা’ ও ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার পর থেকেই মুনিরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার ঠিক আগে ট্রাম্প দুটি ফোনকল করেন—একটি মুনিরকে এবং অন্যটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। ঐতিহাসিকভাবে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র, যার শক্তিশালী সেনাবাহিনী ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন>>ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের শান্তি প্রস্তাবে কী আছে?শান্তি প্রস্তাব নিয়ে ‘রাতভর’ যোগাযোগ পাকিস্তানের সেনাপ্রধানেরইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতা করতে চেয়ে সক্রিয় পাকিস্তান, কোণঠাসা হচ্ছে ভারত?

যদিও সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্ক ওঠানামা করেছে—বিশেষ করে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার কারণে সম্পর্ক দুর্বল হয়েছিল—তবে ট্রাম্পের সময়ে তা আবার দৃশ্যমানভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের চারদিনের যুদ্ধের সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি নিজেই যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছেন। দিল্লি যদিও তা স্বীকার করেনি, তবে ইসলামাবাদ সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে এবং ট্রাম্পকে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রচার করে। এমনকি তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দেয়। এগুলো পাকিস্তানের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন আরও জোরালো করেছে বলে মনে করা হয়।

মেরিল্যান্ডের ম্যাকড্যানিয়েল কলেজের অধ্যাপক আকিল শাহ এই কৌশলকে ‘চাটুকারিতাকে পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে ব্যবহার’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, ট্রাম্পের প্রশংসা পাওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান কৌশলগতভাবে সুবিধা নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের এক ধরনের নেতৃত্বে দেখতে চায়। তাই ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক, ইরানের প্রতিবেশী হওয়া এবং দেশের উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী—সব মিলিয়ে তারা একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে।’

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত বৈঠক আগামী শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে কি না বা যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে কি না- তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিশ্লেষক স্বরণ সিং বলেন, পরিস্থিতি এখনো জটিল, বিশেষ করে ইসরায়েল এই আলোচনার অংশ নয়। ‘এটি ইতিবাচক সংকেত, কিন্তু এখনো অনেক জটিলতা ও বাধা রয়ে গেছে। পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় যেতে এটি বেশ কঠিন হবে।’

বিশ্লেষকরা আরও সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আস্থার অভাব ভবিষ্যৎ আলোচনা কঠিন করে তুলতে পারে। আগের দুই দফা আলোচনা ভেস্তে গিয়ে সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছিল, যা এই সম্পর্কের অস্থিরতাকেই তুলে ধরে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও এই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এতে কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয় এবং পথটি এখনো অনেকাংশে বন্ধ।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময় নিরাপদ জাহাজ চলাচল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হবে। এই পরিকল্পনায় ইরান ও ওমান জাহাজ চলাচলে ফি নিতে পারবে এবং তেহরান সেই অর্থ পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে পারে।

ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মার্ফি ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তিনি ইরানের জন্য ‘ইতিহাস বদলে দেওয়া জয়’ এনে দিয়েছেন এবং একে ‘চমকপ্রদ ও হতাশাজনক অদক্ষতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকেএএ/