গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার ওপর মানুষের প্রত্যাশা ছিল নাজেহাল অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে দেশকে একটি শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করিয়ে দেবেন। তবে নানান কারণে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি। ঋণে জর্জরিত অবস্থা থেকেই বিদায় নিয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর বহুল আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ঋণনির্ভরতার সেই পথই পেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাস বা ৪৩ দিনের মধ্যেই নতুন সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। ড. ইউনূসের শেষদিকের কিছু সময় আর নতুন সরকারের সময় মিলে সর্বশেষ তিন মাসে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়।
মূলত রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে এমন ঋণনির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। ফলে চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের নির্ধারিত ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে মাত্র ৯ মাসেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে ব্যাংকঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঋণবৃদ্ধির প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত বহন করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি স্থবির অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেছে।
আরও পড়ুনবর্তমান এমপিদের খেলাপি ঋণ ৩৩৩০ কোটি টাকা: অর্থমন্ত্রীএকীভূত করার পরও সংকট, পাঁচ ব্যাংককে ২৭২১ কোটি টাকা ঋণউচ্চ খেলাপির কারণে লভ্যাংশ দিতে পারবে না অর্ধেক ব্যাংক
অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কেনাকাটার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবেন এমন প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রয়োজনীয় সংস্কারও সেভাবে হয়নি। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। একই সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিও নেতিবাচক অবস্থায় ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।- মহিউদ্দিন রুবেল, সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি খাত প্রাধান্য দিয়ে এগোনো উচিত। তবে বর্তমানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না। সরকার একটি কঠিন অবস্থায় ক্ষমতায় এসেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি শক্তিশালী অর্থনীতি নিয়ে এগোনো, কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে জ্বালানি সংকটে পড়তে হয়েছে। সামনে আরও ঘাটতির আশঙ্কাও রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবেন এমন প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রয়োজনীয় সংস্কারও সেভাবে হয়নি। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। একই সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিও নেতিবাচক অবস্থায় ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।’
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিয়েই এগোতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা ভাবা উচিত। যদিও ঋণ না নেওয়াই ভালো, কিন্তু বাস্তবতায় ঋণ ছাড়া চলা কঠিন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও অর্থনীতিতে নানা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। দেশ স্বনির্ভর না হলে ঋণের ওপর নির্ভর করতেই হবে।’
রাজস্ব আদায় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে দুরবস্থা থাকা সত্ত্বেও সরকারের ব্যয় কমেনি; বরং তা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব ব্যয় আরও বৃদ্ধি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা এরই মধ্যে পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছ ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বাজেটে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ালে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতো। তাই সরকারকে জ্বালানিতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে বেসরকারি খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল নয়, তাই টিকে থাকতে ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক উন্নত দেশ জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে। গত ১৪ মাসে রপ্তানি ও বিনিয়োগ দুটিই আশানুরূপ হয়নি।’
আরও পড়ুন৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশিদুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ বেড়েছে ১৩৬০০ কোটি টাকাচ্যালেঞ্জ ঋণ পরিশোধ, পাশে থাকার আশ্বাস দাতাদের
সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা শেষ তিন মাসে আরও বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ এই সময়ই প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা আগের ছয় মাসের মোট ঋণের চেয়েও বেশি।
আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মাত্র দেড় মাসে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এই স্বল্প সময়ই ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি এভাবে আগ্রাসীভাবে ঋণ নিতে থাকে, তবে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। এর বড় অংশই নেওয়া হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে আমি ঋণ বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে মিশ্র সংকেত হিসেবে দেখছি। কারণ ব্যাংকঋণের দ্রুত বৃদ্ধি একদিকে অর্থনীতিতে তারল্য জোগালেও অন্যদিকে এটি মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে স্বল্পসময়ে বিপুল পরিমাণ ঋণগ্রহণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছি।- তাসকীন আহমেদ, সভাপতি, ডিসিসিআই
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে আমি ঋণ বৃদ্ধির এই প্রবণতাকে মিশ্র সংকেত হিসেবে দেখছি। কারণ ব্যাংকঋণের দ্রুত বৃদ্ধি একদিকে অর্থনীতিতে তারল্য জোগালেও অন্যদিকে এটি মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে স্বল্পসময়ে বিপুল পরিমাণ ঋণগ্রহণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছি।’
তিনি বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি মনে করি, এই ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতে যেমন শিল্প, অবকাঠামো ও রপ্তানিমুখী খাতে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে আমরা চাই ঋণের সুষম বণ্টন ও উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ। তবে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা বা অপ্রয়োজনীয় খাতে ঋণ প্রবাহিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি।’
আরও পড়ুনমানুষের হাতে নগদ টাকা আবার বাড়ছেগভীর সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকেরএপ্রিলের ৭ দিনেই রেমিট্যান্স এলো ১০ হাজার ৪০ কোটি টাকা
গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নেওয়া ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে এবং একই সঙ্গে বেসরকারি খাত গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।’
তিনি চীনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের কারণে দেশটি বাইরের চাপ তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করে।’
হেলাল আহমেদ আরও বলেন, ‘কোনোভাবেই যেন দেশ ঋণের ফাঁদে না পড়ে এটি সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে সরকারকে বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।’
তার মতে, ‘এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে দেশের নিজস্ব সম্পদ আহরণে। বিশেষ করে রাজস্ব বৃদ্ধি করার ওপর জোর দেওয়া জরুরি, যেন অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা যায়।’
ইএআর/ইএ