দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ বেড়েছে ১৩৬০০ কোটি টাকা

ইয়াসির আরাফাত রিপন
ইয়াসির আরাফাত রিপন ইয়াসির আরাফাত রিপন
প্রকাশিত: ০৮:০১ পিএম, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
নির্বাচনের আগে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বেড়েছে, ছবি: জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

নির্বাচনের আগে দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে ব্যাপক টাকা উত্তোলনের এই প্রবণতা গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানি কমেছে প্রায় ১৮ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।

এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই অঙ্ক আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ডিসেম্বরের তুলনায় এক মাসে বৃদ্ধি পায় প্রায় ৭ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মানুষ ব্যাংক থেকে যে টাকা তুলে নিয়ে আর ব্যাংকে ফেরত দেয় না, সেটিই ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকা হিসেবে ধরা হয়।

দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ বেড়েছে ১৩৬০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইল ছবি

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোট দিতে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যায় সারা দেশের মানুষ। সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। এতে ভোটারদের ব্যক্তিগত খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন ধরনের লেনদেন ও কেনাকাটা বাড়ে। তাতে নগদ টাকার চাহিদাও বাড়ে।

ব্যাংকাররা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংক থেকে নগদ উত্তোলনও বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুন
মানুষের হাতে নগদ টাকা আবার বাড়ছে
গভীর সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের
এপ্রিলের ৭ দিনেই রেমিট্যান্স এলো ১০ হাজার ৪০ কোটি টাকা
ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামানোর আহ্বান এফবিসিসিআইয়ের

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে সরকারের ব্যয়ও ছিল। ফলে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে।

তিনি বলেন, গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমছিল। তবে বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর থেকে আবার তা বাড়তে শুরু করে।

নির্বাচনের আগে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেশি থাকা মানেই যে তা নির্বাচনকেন্দ্রিক খরচে ব্যবহৃত হয়েছে এমনটি নয়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি বছরের শেষ ও শুরুর সময় হওয়ায় এ সময়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রম থাকে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ায় স্কুলে ভর্তি, বইপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা এবং অন্যান্য খরচ বাড়ে। অনেকেই এ সময় ঘুরতেও যান। - আরিফ হোসেন খান, নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা ধীরে ধীরে ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে এবং সেই ধারা চলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর মার্চে তা আবার বাড়ে। এপ্রিল মাসে কিছুটা কমলেও মে ও জুনে আবার বাড়ে। তবে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আবার কমতে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটও মানুষের হাতে নগদ টাকা বাড়ার একটি কারণ ছিল। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রাখেন। এতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়।

 

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে এবং ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। এদিকে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বাড়লেও কমেছে মুদ্রা সরবরাহ।

দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ বেড়েছে ১৩৬০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে রিজার্ভ মানি ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে রিজার্ভ মানি কমেছে প্রায় ১৮ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা।

এবারের নির্বাচনটি উৎসবমুখর হওয়ায় এর প্রভাব আরও বেশি ছিল। অনেক মানুষ কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে ভোট দিতে নিজ নিজ গ্রামে চলে যান, ফলে যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে তারা অতিরিক্ত টাকা তুলেছেন। - এম হেলাল আহমেদ জনি, ব্যাংকখাত বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ

গবেষণাভিত্তিক থিংক ট্যাংক চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংকখাত বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। সাধারণত নির্বাচনের সময় নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য অনেকেই ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন করেন। তবে এবারের নির্বাচনটি উৎসবমুখর হওয়ায় এর প্রভাব আরও বেশি ছিল। অনেক মানুষ কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে ভোট দিতে নিজ নিজ গ্রামে চলে যান, ফলে যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে তারা অতিরিক্ত টাকা তুলেছেন।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রমও শুরু হয়। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফি ও অন্যান্য খাতে অভিভাবকদের বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। এ কারণে অনেক অভিভাবক আগেভাগেই ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে রাখেন।

হেলাল আহমেদ জনি বলেন, এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনি কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রার্থীদের ব্যয়। নির্বাচনের আগে প্রচারণা, সাংগঠনিক কার্যক্রমসহ নানা খাতে নগদ অর্থের ব্যবহার বাড়ে। ফলে ব্যাংক থেকে নগদ উত্তোলনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নির্বাচনের পরপরই রোজা শুরু হওয়া এবং মাসের মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ওই সময় মানুষের স্বাভাবিক পারিবারিক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচও বেড়েছিল। এসব মিলিয়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে টানা দুই মাস ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন
নির্বাচন ঘিরে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছে
মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা আবার ব্যাংকে ফিরছে
মার্চে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশ

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, সাধারণত বছরের শেষ কিংবা শুরুর দিকে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যায়। এ সময় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে বাসাবাড়ি পরিবর্তন করেন বা বিভিন্ন ব্যক্তিগত খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করেন।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেশি থাকা মানেই যে তা নির্বাচনকেন্দ্রিক খরচে ব্যবহৃত হয়েছে এমনটি নয়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি বছরের শেষ ও শুরুর সময় হওয়ায় এ সময়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রম থাকে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ায় স্কুলে ভর্তি, বইপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা এবং অন্যান্য খরচ বাড়ে। অনেকেই এ সময় ঘুরতেও যান।

আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, এবারের নির্বাচনও বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদের সময়ের মতো অনেক মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে গেছেন। ফলে অনেকেই নগদ অর্থ সঙ্গে নিয়ে গ্রামে গিয়েছেন। এসব কারণেই ওই সময়ে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ কিছুটা বেশি দেখা গেছে।

ইএআর/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।