জীবন পালকারখানার ভেতরে ঢুকলেই শোনা যায় বাঁশ কাটার শব্দ। কোথাও আবার কারিগরের হাতে তৈরি হচ্ছে দেয়ালঘড়ির ফ্রেম, কেউ বাঁশের চিকন টুকরো দিয়ে বানাচ্ছেন ফুলদানি বা ট্রে। এই ব্যস্ততার মাঝেই এক কারিগরের কাজ দেখে পরামর্শ দিচ্ছেন সুইটি সূত্রধর। ছোট এই কারখানাটিই এখন তার স্বপ্নের জায়গা।
তবে এই স্বপ্নের শুরু হয়েছিল খুব ছোট করে মাত্র একটি বাঁশ দিয়ে। তিন বছর আগে নিজের জীবনের পথ বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন সুইটি। তখন তিনি একটি সমবায় সমিতিতে চাকরি করতেন। নিয়মিত চাকরি থাকলেও মনে হচ্ছিল, নিজের মতো করে কিছু করা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই চাকরি ছেড়ে নতুন উদ্যোগের পথে হাঁটেন তিনি।
বেত ও বাঁশের কারুশিল্পের প্রতি আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। ইন্টারনেটে ভিডিও দেখে এবং বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ধীরে ধীরে শিখে নেন কাজের কৌশল। সিলেট অঞ্চলে সহজে বাঁশ ও বেত পাওয়া যায় এই বিষয়টিও তাকে উৎসাহ দেয়।
শুরুর সময়টা খুব সহজ ছিল না। অনেকেই মনে করেছিলেন, বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিস দিয়ে ব্যবসা দাঁড় করানো কঠিন। কিন্তু সেই সংশয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যান সুইটি। কোথাও ঋণ পাচ্ছিলেন না। তবে ব্যবসা শুরুর পর প্রথম কৃষি ব্যাংক থেকে ২ লাখ টাকা প্রণোদনা পান। বছর শেষ হতে না হতেই ঋণ পরিশোধ করেন। পরবর্তিতে আবারও কয়েক দফায় ঋণ প্পান এবং ব্যবসা বাড়াতে থাকেন।
প্রথম দিকে ছোট ছোট শোপিস বানিয়ে কাজ শুরু হয়। ধীরে ধীরে পণ্যের ধরনও বাড়তে থাকে। এখন তার প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয় দেয়ালঘড়ির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, ট্রে, ফুলদানি, লাইটের কাঠামোসহ ঘর সাজানোর নানা পণ্য।
সিলেটের তামাবিল বাইপাস সড়কের পাশে পূর্ব কল্লগ্রাম এলাকায় এখন রয়েছে তার প্রতিষ্ঠান ‘এসএস গ্যালারি ক্রাফট’। সেখানে একটি ছোট শোরুমের পাশাপাশি রয়েছে কারখানাও। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫ জন কারিগর কাজ করছেন। ব্যবসার পরিধিও ধীরে ধীরে বেড়েছে। এখন তার উদ্যোগের পুঁজি প্রায় ১৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। এছাড়াও অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও তার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তার পণ্যের অর্ডার আসে। মাসে প্রায় লাখ টাকা আয় হয় তার।
এই উদ্যোগের আরেকটি দিক হলো নারীদের সম্পৃক্ততা। আশপাশের অনেক গৃহিণীও এখন এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। কেউ বাসায় বসে ছোটখাটো কাজ করেন, কেউ সময় পেলে কারখানায় এসে কাজ করেন। এতে তাদের বাড়তি আয় যেমন হচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বিভিন্ন উদ্যোক্তা মেলা ও প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন সুইটি। এসব আয়োজন থেকে পেয়েছেন স্বীকৃতিও। তবে তার স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। সুইটি চান, একদিন তার এই কারখানায় অন্তত ১০০ জন মানুষ কাজ করবেন। তখনই তিনি মনে করবেন, তার উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে সফল হয়েছে। একটি বাঁশ দিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগ আজ শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়, বরং অনেক মানুষের সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে।
কেএসকে