ফিচার

বৈসাবি উৎসব: পাহাড়ে নববর্ষের অনন্য আয়োজন

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন বাঙালির প্রাণের উৎসব পালিত হয়। পহেলা বৈশাখ নানান আয়োজনে দিনটি উদযাপন করেন বাংলা ভাষাভাষির মানুষ। তবে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে বছর ঘুরে আসে এক বর্ণিল উৎসবের ঋতু। চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিনজুড়ে আয়োজিত হয় এক উৎসব। এই উৎসবকে সামগ্রিকভাবে বলা হয় বৈসবি, যা তিনটি আলাদা জাতিগোষ্ঠীর তিনটি আলাদা নামের উৎসবের সমন্বয়: বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু। নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া, পুরোনোকে বিদায় জানানো এবং প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক অনন্য আয়োজন এটি।

ত্রিপুরা, মারমা এবং চাকমা জনগোষ্ঠীর এই উৎসবগুলো নাম ও কিছু আচার-অনুষ্ঠানে ভিন্নতা থাকলেও মূলত একই দর্শন বহন করে। পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে আনন্দ, শুদ্ধতা ও কৃতজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বরণ করে নেওয়া।

এই উৎসবের উৎপত্তি বহু প্রাচীন এবং এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সৌরবর্ষভিত্তিক নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা মূলত প্রকৃতি ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টি তাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

চৈত্রের শেষ প্রান্তে প্রকৃতির পুরোনো রূপ ঝরে গিয়ে যেমন নতুনের আবির্ভাব ঘটে, তেমনি মানুষও এই সময় নিজেদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে, মন-মানসিকতা শুদ্ধ করে এবং নতুন বছরের জন্য প্রস্তুত হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রভাবও এই উৎসবে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়, যেখানে দান, প্রার্থনা ও জীবের মঙ্গল কামনা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

তিন দিনের এই উৎসবের প্রতিটি দিনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। প্রথম দিনটি সাধারণত ফুল বিজু বা বৈসুকের সূচনাদিবস হিসেবে পরিচিত, যেখানে ভোরে নদী বা ঝর্ণা থেকে পানি এনে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা হয় এবং ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এটি মূলত প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পুরোনো বছরের সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার প্রতীক।

দ্বিতীয় দিনটি সবচেয়ে আনন্দমুখর, যা মূল বিজু বা সাংগ্রাই হিসেবে উদযাপিত হয়। এই দিনে মানুষ নতুন পোশাক পরে, নাচ-গান ও নানা আনন্দঘন আয়োজনের মাধ্যমে সময় কাটায়। বিশেষ করে মারমা সম্প্রদায়ের মধ্যে পানি ছিটানোর প্রথা বেশ জনপ্রিয়, যা শুদ্ধতা ও শুভকামনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তৃতীয় দিনটি নতুন বছরের সূচনাদিবস, যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ নেওয়া, দান-ধ্যান করা এবং মন্দিরে প্রার্থনার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনা করা হয়।

বৈসবি উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ঐতিহ্যবাহী খাবার। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘পাঁচন’, যা বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ পদ। অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ রকমের সবজি একসঙ্গে রান্না করা হয়, যা জীবনের বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া পিঠা, স্থানীয় মিষ্টান্ন, শুকনো মাছের নানা পদ এবং ভাত-ভিত্তিক খাবারও এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাবারের মধ্য দিয়েও এই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটে।

বৈসবি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও এই উৎসব এখনও মানুষকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে এবং মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির গভীর সম্পর্কের কথা। পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার এই আয়োজন তাই শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও পড়ুন৩২ বছর ধরে ডাকটিকিট সংগ্রহ করছেন চিকিৎসক মশিউরবেড়েছে নববর্ষের আনন্দ, কমেছে বাংলা ক্যালেন্ডারের চাহিদা

কেএসকে