দেশের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা গেলেও প্রতিনিয়েত বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাও বাড়ছে। চলতি এপ্রিল মাসে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব ৩১৭টি করে বেড়েছে। এই বিও হিসাবের মধ্যে যেমন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা রয়েছেন, তেমনই বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে স্থানীয় ও বিদেশি উভয় শ্রেণীর বিনিয়োগকারী বাড়ছে।
বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও, এর আগে দীর্ঘদিন দেশের শেয়ারবাজার থেকে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ফলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারী আবার বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
চলতি মাসের প্রথম ১৪ দিনে (৯ কার্যদিবস) শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে বেড়েছে ২ হাজার ৮৫৬টি। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড়ে বিও হিসাব বেড়েছে ৩৭১টির বেশি। এর মধ্যে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ২৬টি। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৩টি করে বিদেশি ও প্রবাসী বিও হিসাব বেড়েছে। এছাড়া এই ৯ কার্যদিবসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৭৭৭টি। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৩০৯টি করে।
বিও হলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস অথবা মার্চেন্ট ব্যাংকে একজন বিনিয়োগকারীর খোলা হিসাব। এই বিও হিসাবের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে লেনদেন করেন। বিও হিসাব ছাড়া শেয়ারবাজারে লেনদেন করা সম্ভব না। বিও হিসাবের তথ্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)।
সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে (১৪ মার্চ পর্যন্ত) শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৩১৮টি। মার্চ শেষে যা ছিল ১৬ লাখ ৫৪ হাজার ৪৬২টি। এ হিসাবে চলতি এপ্রিল মাসে শেয়ারবাজারে বিও হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৮৫৬টি।
বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ২২৬টি। মার্চ শেষে যা ছিল ৪৩ হাজার ২০০টি। অর্থাৎ চলতি মাসের ১৪ দিনে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে বেড়েছে ২৬টি। দেড় মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৮৪টি। ফেব্রুয়ারি মাস শেষে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৪৩ হাজার ১৪২টি।
বর্তমানে বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে শেয়ারবাজার ছাড়তে থাকেন। যা অব্যাহত থাকে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেও।
আরও পড়ুনমন্ত্রীর আশ্বাসের প্রতিফলন নেই বাজারে, মিলছে না বোতলের সয়াবিন তেল শেয়ারবাজারের ‘সোনার হরিণ’ বাংলাদেশ অটোকারস
২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৪৩ হাজার ১০১টিতে নেমে আসে। অর্থাৎ, বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমে যায় ১২ হাজার ৪১১টি। এখন আবার তাদের ফিরতে দেখা যাচ্ছে। এরপরও ২০২৩ সালের তুলনায় এখনো দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ১২ হাজার ২৮৬টি কম রয়েছে।
স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের চিত্রবিদেশি ও প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের শেয়ারবাজার স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাও বাড়তে দেখা যাচ্ছে। সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৯৯টি, যা মার্চ শেষে ছিল ১৫ লাখ ৯৩ হাজার ২২২টি। ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ১৬ হাজার ৯৭৬টি।
তবে, বর্তমানে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়লেও এর আগে বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৩১৮টি। অর্থাৎ, ২০২৪ সালের শুরুর তুলনায় বর্তমানে বিও হিসাব কম আছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৩৩টি।
নারী-পুরুষ উভয় বিনিয়োগকারী বাড়ছেবর্তমানে শেয়ারবাজারে যেসব বিনিয়োগকারী আছেন, তার মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০৬টি। গত বছর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব বেড়েছে ১৩ হাজার ৭৬৩টি। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসে বেড়েছে ২ হাজার ৩০৪টি। মার্চ শেষে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার ২০২টি।
বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৭১৯টি। ২০২৫ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯টি। এ হিসাবে চলতি বছরে নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৮৯০টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৪৯৯টি। মার্চ মাস শেষে নারী বিনিয়োগকারীর নামে বিও হিসাব ছিল ৩ লাখ ৯১ হাজার ২২০টি।
বেড়েছে কোম্পানির বিও হিসাবওনারী-পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি চলতি বছরে কোম্পানির বিও হিসাবও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৮ হাজার ৯৩টি। ২০২৫ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৮০৩টি। এ হিসাবে চলতি বছরে কোম্পানি বিও হিসাব বেড়েছে ২৯০টি। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৫৩টি। মার্চ মাস শেষে কোম্পানির বিও হিসাব ছিল ১৮ হাজার ৪০টি।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৩২টি, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫টি। অর্থাৎ, চলতি বছরে একক নামে বিও হিসাবে বেড়েছে ১৫ হাজার ১১৭টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে বেড়েছে ২ হাজার ৫২৭টি। মার্চ শেষে একক নামে বিও হিসাব ছিল ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৩০৫টি।
বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৯৩টি। ২০২৫ সাল শেষে যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ চলতি বছরে যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে এক হাজার ৫৩৬টি। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাসে বেড়েছে ২৭৬টি। মার্চ শেষে যৌথ নামে বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ১১৭টি।
এমএএস/কেএসআর