মন্ত্রীর আশ্বাসের প্রতিফলন নেই বাজারে, মিলছে না বোতলের সয়াবিন তেল
ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সয়াবিন তেলের বোতলের তীব্র সংকট রয়েই গেছে। কোথাও কোথাও একেবারেই মিলছে না বোতলের তেল, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এ পরিস্থিতিতে খোলা সয়াবিন তেলই ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও দাম বেড়ে কেজিপ্রতি দাঁড়িয়েছে ২১০ টাকায়।
গত ১২ এপ্রিল ভোজ্যতেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ওই বৈঠকে তিনি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কোনোভাবেই দাম না বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। তবে বৈঠকের দুই দিনের মাথায় বাজার ঘুরে ভিন্ন চিত্র দেখা গেলো।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, শন্তিনগর, সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকায় খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই বোতলের সয়াবিন তেল নেই। অনেক দোকানি জানিয়েছেন, কয়েকদিন ধরেই তারা ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। ফলে শুধু খোলা তেল বিক্রি করতে হচ্ছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় বোতলের তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক কোম্পানি নিয়মিত তেল সরবরাহ না করায় বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কিছু দোকানি জানান, ডিলারদের কাছ চাহিদা দিয়েও বোতলের তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় তেল মজুত করে রেখেছেন। এতে করে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভোজ্যতেলের বাজার স্বাভাবিক রাখতে গত ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো শুনেছি। এগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে খুব দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে, যাতে সরবরাহ চেইন অব্যাহত রাখা যায়।
মন্ত্রী বলেন, সরকার ভোক্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি একটি সংবেদনশীল সময়। ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
টাকা দিয়েও মিলছে না বোতলজাত সয়াবিন তেল, মুরগির দামে আগুন
ইলিশ এখন ‘স্বপ্নের মাছ’
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্যের দাম বাড়ানো হোক তা সরকার চায় না। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে, এই সময়ে যেন কোনো পণ্যের দাম না বাড়ে। সেটিকে লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে আমরা পদক্ষেপ নেবো।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীর বৈঠকের পর দুদিন পার হলেও বাজারে সয়াবিত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। মালিবাগ হাজীপাড়ার ব্যবসায়ী মো. আফজাল হোসেন জানান, আমরা বোতলের সয়াবিন তেলের জন্য কোম্পানির কাছে চাহিদা দিয়েছি, কিন্তু তেল আসেনি। দুদিন ধরে কোম্পানির লোক আসছেও না। শুনছি দাম বাড়লে তারপর নাকি বাজারে তারা তেল ছাড়বে। বাস্তবতা কী জানি না।
তিনি বলেন, বোতলের সয়াবিন তেল না থাকায় খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগে যে খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি, এখন তা ২১০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। এই দাম বাড়ার পিছনে আমাদের কোনো হাত নেই। পাইকারিতে খোলা সায়বিন তেলের দাম বেড়ে গেছে। ফলে আমাদেরকে বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
হাজীপাড়া অঞ্চল ঘুরে একটি দোকানে সয়াবিন তেলের দুই লিটারের কয়েকটি বোতল দেখা যায়। ওই দোকানের মালিক আফসার আলী বলেন, সয়াবিন তেল দুই লিটারেরর বোতল ৪০০ টাকা বিক্রি করছি। আমার কাছে আর পাঁচ বোতল আছে। এর বাইরে আরও কোনো বোতল নেই। পাঁচ লিটারের বোতল কয়েকদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। কয়েকদিন ধরে কোম্পানির লোক আসছে না, ফলে আমারও তেল কিনতে পারছি না। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।
হাজীপাড়া থেকে মালিবাগ বাজারে এসেও বোতলের সয়াবিন তেলের সংকট দেখা যায়। আলমগীর হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, কয়েকদিন ধরেই বোতলের সয়াবিন তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কী কারণে কোম্পানিগুলো তেল দিচ্ছে না, তা আমরা বলতে পারবো না। তবে শুনেছি তাদের খরচ বেড়ে গেছে, তাই তারা দাম বাড়াতে চান। দাম বাড়ালে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
সেগুনবাগিচায় তেল কিনতে আসা আমানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দোকান ঘুরেছি, কোথাও সয়াবিন তেলের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে খোলা তেল কিনছি। খোলা তেলের দাম রাখছে ২১০ টাকা কেজি। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি, দিন দিন সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
মালিবাগে তেল কিনতে আসা আক্তারুজ্জামান টিটু বলেন, পত্রিকায় দেখলাম তেলের দাম বাড়বে না, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। কিন্তু বাজারে তো বোতলের সয়াবিন তেল পাচ্ছি না। বাজার থেকে সয়াবিন তেলের বোতল উধাও হয়ে গেছে। মন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, কিন্তু বাজার ঘুরে দেখেছেন কি না সন্দেহ আছে।
তিনি বলেন, দাম বাড়ানো হলেই দেখবেন বাজারে তেলের অভাব নেই। তাহলে এখন যে বাজারে তেল নেই, এটা তো নিশ্চয় স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। নিশ্চয় ব্যবসায়ীরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। সরকারের উচিত বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং সংকটকালীন যারা বাজারে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। এমনটা করা না হলে বারবার এমন দৃশ্য আমাদের দেখতে হবে।
এমএএস/কেএসআর