অর্থনীতি

ডলারের স্বস্তিতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা বেড়েছে

শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলা কমেছে ২.২৮%, নিষ্পত্তি কমেছে ২.০৬% ভোগ্যপণ্যে এলসি খোলা বেড়েছে ৮.৩৬%, তবে নিষ্পত্তি সামান্য কমেছে জ্বালানি আমদানিতে এলসি খোলা কমেছে ৫.৭৩%, নিষ্পত্তি কমেছে ৮.৭৫% বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩%, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন নির্বাচিত সরকারের অধীনে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা সংশ্লিষ্টদের

দেশে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়ায় ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। চাহিদামতো ডলার পাওয়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবে একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি ডলার। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তা বেড়ে ১২১ কোটি ডলার হয়েছে। সেই হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এলসি খোলা বেড়েছে ১৫ কোটি ডলার বা ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলা বাড়লেও কমেছে নিষ্পত্তি। তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ১২৭ কোটি ডলারের। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তা কমে দাঁড়ায় ১১১ কোটি ডলারে। সেই হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৬ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

আরও পড়ুনমানুষের হাতে নগদ টাকা আবার বাড়ছেগভীর সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকেরএপ্রিলের ৭ দিনেই রেমিট্যান্স এলো ১০ হাজার ৪০ কোটি টাকাব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামানোর আহ্বান এফবিসিসিআইয়ের

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছেছে। বিনিয়োগ নেই এখন। তবে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের অধীনে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে এমন আশায় এলসি খোলা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের বেশি সময়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ ভাটা পড়েছিল। যদিও এসময়ে দেশ থেকে অর্থপাচার কমেছে। পরের মাসগুলোতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুটোই বাড়বে এমন প্রত্যাশা তাদের।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা ভাটা ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট রপ্তানিখাতে কার্যাদেশ কমিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যেও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলা বাড়ছে মানে আশা জাগাচ্ছে, ব্যবসা বাড়ার ইঙ্গিত এটা। আবার এলসি নিষ্পত্তি কমা মানেই ব্যবসা কমা নয়। কারণ এলসির নিষ্পত্তি হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়।

এ উদ্যোক্তা জানান, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি থাকলেও বিনিয়োগ কম। নির্বাচনের পর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে এই আশায় এলসি খোলা বাড়ছে। দেড় বছর ধরে বাণিজ্যে ভাটা থাকলেও অর্থপাচার কমেছে। আশা করি সামনে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি আরও বাড়বে।

আরও পড়ুনআরব সংকটে কাঁপছে বিশ্ব ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিডলার তুলে নেওয়া ‘স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি’মার্চে এলো সর্বকালের রেকর্ড রেমিট্যান্সযুদ্ধ উত্তেজনাতেও স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রাবাজার

এছাড়া আলোচিত সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুটোই কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫০৪ কোটি ডলার এবং এলসি নিষ্পত্তি করা হয় এক হাজার ৪১৫ কোটি ডলারের।

চলতি অর্থবছরের একই সময়ে (প্রথম সাত মাস) শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৬৯ কোটি ডলার এবং এলসি নিষ্পত্তি করা হয় এক হাজার ৩৮৬ কোটি ডলারের। সে হিসাবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এলসি খোলা কমেছে ৩৫ কোটি ডলার বা ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৯ কোটি ডলার বা ২ দশমিক ০৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইল ছবি

ভোগ্যপণ্য আমদানিতে চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) এলসি খোলা হয় ৪৩২ কোটি ডলারের এবং এলসি নিষ্পত্তি হয় ৩৬৩ কোটি ডলারের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এলসি খোলা হয়েছিল ৩৯৯ কোটি ডলারের। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ৩৬৫ কোটি ডলারের। সে হিসাবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এলসি খোলা বেড়েছে ৩৩ কোটি ডলার বা ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২ কোটি ডলারের বা ০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

আলোচিত সময়ে জ্বালানি আমদানিতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি উভয়ই কমেছে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) জ্বালানি আমদানিতে মোট ৪৯৫ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়, একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি করা হয় ৫০৭ কোটি ডলারের। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৫২৫ কোটি ডলারের। এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ৫৫৬ কোটি ডলারের। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এলসি খোলা কমেছে ৩০ কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৪৯ কোটি ডলারের বা ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

আরও পড়ুনমধ্যপ্রাচ্য সংকটে দেশে বাড়লো ডলারের দামরিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৫.৩৩ বিলিয়ন ডলারদুই ব্যাংক থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার কিনলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকযুদ্ধের প্রভাবে আইএমএফের ঋণ সহায়তা বাড়তে পারে ২০ বিলিয়ন ডলার

অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা ডিসেম্বরের ৬ দশমিক ১ শতাংশের চেয়েও কম। দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদের হার এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রভাব সব মিলিয়ে এ পতন ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যেখানে এই হার ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, সেখান থেকে তা ধারাবাহিকভাবে কমছে। যদিও নভেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে উঠেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, তা প্রকৃত নতুন বিনিয়োগের ফল নয়; বরং জাতীয় নির্বাচনের আগে ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে এই বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, নিকট ভবিষ্যতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম।

আরও পড়ুননির্বাচন ঘিরে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছেমানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা আবার ব্যাংকে ফিরছেমার্চে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশইরান যুদ্ধে অর্থনীতিতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

এসব বিষয়ে কথা হয় বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। নতুন অর্ডারও কমছে। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা। এসবের মাঝে এলসি খোলা বাড়া মানে ব্যবসায়ীরা আশা দেখছেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই দুটি বিষয় মোকাবিলা করতে পারলে অর্থনীতি টিকে থাকবে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের মতো অভ্যন্তরীণ কাজগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা না করে এখনই এগিয়ে নেওয়া উচিত।

ইএআর/এমএমএআর/এমএফএ