যুদ্ধ উত্তেজনাতেও স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রাবাজার

ইয়াসির আরাফাত রিপন
ইয়াসির আরাফাত রিপন ইয়াসির আরাফাত রিপন
প্রকাশিত: ১২:৫৫ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬
ছবি এআই নির্মিত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, টাকার বিনিময় হারের ওপর কোনো তাৎক্ষণিক চাপ নেই এবং বাজারে স্বাভাবিক ধারা বজায় রয়েছে। বরং এই সময়ের মধ্যেই এক মাসে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বেড়েছে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার। সবশেষ ৬ এপ্রিল ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২৬ ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তারল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে একই সময়ে ডলারের দামে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। এক মাস আগে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে প্রতি ডলার বিক্রি করত ১২২ টাকা ৩০ পয়সায়, যা বেড়ে গত মঙ্গলবার ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় ওঠে। যদিও শনিবার কিছুটা কমেছে। রেমিট্যান্স হাউসগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সর্বোচ্চ দর ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল, পরে তা কিছুটা কমেছে। তবে এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

jagonews24

আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় লেনদেন হচ্ছে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে এই হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসে বৃদ্ধি মাত্র ৪৫ পয়সা।

বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। টাকার বিনিময় হারের ওপর কোনো তাৎক্ষণিক চাপ নেই এবং সরবরাহ-চাহিদা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হচ্ছে।

খোলা বাজারে ডলারের দাম কিছুটা বেশি। বর্তমানে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৬ টাকা থেকে ১২৬ টাকা ৩০ পয়সায়, যা গত মাসে ছিল প্রায় ১২৪ টাকা। তবে ডলার ব্যবসায়ীদের মতে, সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছিল, এখন আবার স্বাভাবিক হচ্ছে। এদিকে এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ডলারের দর কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে ১২৩ টাকা ২০ থেকে ১২৩ টাকা ৩০ পয়সায় এলসি নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় ২৫ থেকে ৩৫ পয়সা বেশি। তবে সরকারি ব্যাংকগুলোতে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন
আরব সংকটে কাঁপছে বিশ্ব ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি
ডলার তুলে নেওয়া ‘স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি’
মার্চে এলো সর্বকালের রেকর্ড রেমিট্যান্স 

ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দাম বাড়ার পেছনে মূলত চাহিদা বৃদ্ধি কাজ করেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও রপ্তানি কম থাকায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কিছুটা বেশি। এছাড়া ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় ব্যাংকগুলো ফরওয়ার্ড বুকিং বাড়িয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে জুন পর্যন্ত বুকিং নেওয়া হয়েছে। এতে ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেও এমন আশঙ্কা করা হয়। এরইমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, নতুন অর্ডারও কমছে। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডলারের দর বাড়ার মূল দুটি কারণ হলো—ডলারের চাহিদা কিছুটা বাড়লেও বাজারে কোনো সংকট নেই এবং রেমিট্যান্স বেড়েও রপ্তানি কমায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকা। এছাড়া, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় ব্যাংকগুলো ফরওয়ার্ড বুকিং বাড়িয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে জুন পর্যন্ত বুকিং নেওয়া হয়েছে। এতে ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়ে দাম কিছুটা বেড়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা মাহবুব বলেন, আমাদের ব্যাংকে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কিছু বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাড়তি দর দেখলেও, এখন বাজার অনেকটাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে।

আরও পড়ুন
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দেশে বাড়লো ডলারের দাম
রিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৫.৩৩ বিলিয়ন ডলার
দুই ব্যাংক থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার কিনলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো শক্তিশালী। ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকগুলোর নগদ বৈদেশিক মুদ্রা ছিল ৪৭.৬ মিলিয়ন ডলার, যা ৬ এপ্রিল বেড়ে ৪৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে।

ব্যাংকগুলোর নেট ওপেন পজিশন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও গত এক মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে কোনো ডলার ক্রয় করেনি। স্বাভাবিকভাবে ডলার কেনা হলে রিজার্ভ আরও বাড়তে পারত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রেমিট্যান্স প্রবাহেও ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। মার্চ মাসে এসেছে রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার। এপ্রিলের প্রথম ৬ দিনেই এসেছে ৬৬০ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৫ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধও স্বাভাবিক রয়েছে। গত মাসে ১.৩৭ বিলিয়ন ডলারের আকু বিল এবং প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।

ডলারের অবমূল্যায়ন হবে—এমন নেতিবাচক ধারণা কিছু সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সব মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এলসি নিষ্পত্তি করতে তাদের ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে, যদিও কিছুটা কমেছে। তবে এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন উদ্যোক্তারা। এ বিষয়টি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) দেখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। টাকার বিনিময় হারের ওপর কোনো তাৎক্ষণিক চাপ নেই এবং সরবরাহ-চাহিদা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ডলারের অবমূল্যায়ন হবে—এমন নেতিবাচক ধারণা কিছু সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সব মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে।

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসান বলেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১২০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেও এমন আশঙ্কা করা হয়। এরইমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, নতুন অর্ডারও কমছে। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা।

‘জ্বালানি তেলের এলসি খোলা আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে এবং এসব এলসি অনেক ক্ষেত্রে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে, যা ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করছে।’ জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানি কম থাকায় বাজারে ডলারের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি, আমদানি বেড়ে গেলে তা সরাসরি চলতি হিসাবের ঘাটতিতে প্রভাব ফেলবে।

ইএআর/এসএইচএস

 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।