আর মাত্র দুইদিন পরই কোরবানির ঈদ। দেশের অন্যতম বৃহত্তম পশুর হাট টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী হাটে এ সময় প্রচুর গরু থাকার কথা। কিন্তু হাটে খাজনা বেশি হওয়ায় গরুর বেপারীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। তাই হাটে গরু নেই বললেই চলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে ৩১ কি.মি. ভূঞাপুর উপজেলা সদর থেকে ৬ কি.মি. এবং বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে যমুনার কোল ঘেঁষে ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহত্তম গরুর হাট। গোবিন্দাসীতে সপ্তাহের রোববার ও বৃহস্পতিবার হাট বসে। তবে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের এক মাস আগে থেকে প্রতিদিনই গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া কেনা-বেচা হয়।
সিলেট, রাজশাহী, রংপুর বিভাগ ছাড়াও ভারত থেকে হাজার হাজার গরুর সমাগম ঘটে এবং গবাদিপশুর ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় পুরো গোবিন্দাসী হাট মুখরিত থাকে। গরু ভর্তি শত শত ট্রাকে হাটের তিনদিকে জট লেগে থাকে। এ সুবাধে হাট এলাকায় দোকানপাট গড়ে ওঠার পাশাপাশি কেউ হোটেল করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, কেউ চা-পান বিক্রি করছেন, কেউ গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল তৈরি করে ভাড়া দিচ্ছেন আবার কেউ গবাদিপশুর খাবার খড় বিক্রি করছেন। এ গরুর হাটকে কেন্দ্র করেই অত্র অঞ্চলের রাজনীতি-অর্থনীতি আবর্তিত হচ্ছে।
তবে বর্তমানে এ গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে চলছে নানা মতবিরোধ আর অনিয়মের অভিযোগ। গত ২৪ ও ২৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার ও রোববার) খোলা ডাকের মাধ্যমে প্রশাসন থেকে ১৬ লাখ টাকায় স্থানীয় জাহিদুল ইসলাম খোকাকে খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু ইজারাদার খোকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের কাছ থেকে গরু প্রতি ৭০০ টাকা খাজনা আদায় করায় গরুর ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেন।
এছাড়া বিক্রেতাদের কাছ থেকেও ১০০-২০০ টাকা খাজনা নেয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতারা ক্ষুব্ধ হন। তারা গরু অন্যত্র বিকিকিনি করার প্রয়াস পান। এর ফলেই এক-দুদিনের মধ্যে গবাদিপশু শূন্য হয়ে পড়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গোবিন্দাসী হাট।
ভূঞাপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, খাস কালেকশনের জন্য স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বাংলা ২৫১০১৪১৪ ইংরেজি ০৭০২২০০৮ নীতিমালা মোতাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সদস্য সচিব, সংশ্লিষ্ট হাটের নিকটবর্তী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের পুরুষ ও মহিলা ইউপি সদস্য, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কমিটির সদস্য থাকার কথা। কিন্তু কমিটির সদস্যদের অবহিত না করে উপজেলা প্রশাসন এক তরফাভাবে খাস কালেকশনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ হাট সংশ্লিষ্টদের।
শুধুমাত্র উপজেলা প্রশাসনের খামখেয়ালির কারণে হাটটি ঐতিহ্য হারিয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এ হাটকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে অর্ধশত গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল মালিক মো. শাহীন মিয়া, শহিদ মিয়া, রজব আলীসহ অনেকেই অভিযোগ করেন, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ মৌসুমে তারা ভালো আয়-রোজগার করেন। কিন্তু অব্যবস্থাপনার জন্য এবার হাটে খাজনা বেশি তাই গরু নেই। সব ক্রেতা-বিক্রেতারা হাট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ঈদের এ সময়টাতে এ এলাকা সরগরম থাকে, কোলাহলে পরিপূর্ণ থাকে হাট। অথচ হাটে গরু নেই, নেই ক্রেতা-বিক্রেতাও।
গরু হাটের বিক্রেতারা জানান, গরু নিয়ে আসলে সঠিক মূল্য না পেয়ে ফেরত নিতে গেলে হাট কর্তৃপক্ষ ঝামেলার সৃষ্টি করে। বাতানের ডগায় গরু বাঁধলে প্রতি গরু ১০০ টাকা অতিরিক্ত নেয়া হয়েছে যা কোনোভাবেই তাদের কাছে প্রত্যাশিত নয়।
গোবিন্দাসী গরু হাট পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও গোবিন্দাসী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু, গোবিন্দাসী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী, মহিলা মেম্বার জান্নাতুল ফেরদৌস, ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, খাস কালেকশনের ইজারা দেয়া ও প্রশাসন কর্তৃক খাজনা আদায়ের ব্যাপারে আমাদের কখনো কোনো দিনই বিষয়টি জানানো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন জানান, অতিরিক্ত খাজনা আদায় অব্যাহত থাকলে ধীরে ধীরে হাটটির অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়বে। এছাড়া সরকার হাট থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটা হতে দেয়া হবে না। খাজনা বেশি আদায় করা হয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/আরএআর/আইআই