বন্যার কারণে লেবু চাষে লোকসানের আশঙ্কা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ১২:২২ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২০২০

টাঙ্গাইলের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় দেলদুয়ার, নাগরপুর ও মির্জাপুর উপজেলার লেবু চাষে ধস নেমেছে। ফলে তিনটি উপজেলার পাঁচ শতাধিক লেবু চাষি পথে বসার উপক্রম। কেউ কেউ লেবু চাষ ছেড়ে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

জানা যায়, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার মধ্যে ছয়টিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লেবু চাষ হয়ে থাকে। এরমধ্যে দেলদুয়ার, নাগরপুর ও মির্জাপুর উপজেলা সমতল ভূমি এবং সখীপুর, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলা পাহাড়ি এলাকা।

জেলার দেলদুয়ার, মির্জাপুর ও মধুপুর উপজেলায় সর্বাধিক লেবু উৎপাদিত হয়। দেলদুয়ার ও মধুপুর উপজেলায় উৎপাদিত লেবু সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘হটেক্স ফাউন্ডেশন’র মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট ২ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হয়। জেলায় এ বছর ৪৩ হাজার মেট্রিক টন লেবু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

তবে এবারের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা আর অতিবৃষ্টির কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। বন্যায় শুধু দেলদুয়ার উপজেলারই ৪০ হেক্টর লেবু বাগান বিনষ্ট হয়েছে।

Tangail-Lemon

সরেজমিনে দেলদুয়ার উপজেলার সদর ইউনিয়ন, লাউহাটী, ফাজিলহাটী, নাগরপুর উপজেলার মোকনা, পাকুটিয়া, মামুদনগর, মির্জাপুরের বানাইল, আনাইতারা, ওয়ার্শী, জামুর্কী ইউনিয়নের লেবু বাগানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি দীর্ঘদিন থাকায় লেবু গাছের গোড়ায় পঁচন ধরে বাগান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

মরে যাওয়া লেবু গাছগুলো বর্তমানে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ চাষি লেবু বাগান বাদ দিয়ে অন্য ফসল উৎপাদনে যাবেন। লেবু চাষিদের দাবি, সরকারি সহযোগিতা ব্যতিত এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব।

দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটী ছয়আনী পাড়া গ্রামের লেবু চাষি মো. রেফাজ তালুকদার, ভবানীপুরের মো. কদম আলী, হুমায়ুন কবীর, নাগরপুরের মোকনা ইউনিয়নের কেদারপুরের মো. নাজিম উদ্দিন, মো. আলম মিয়া, মো. ইউসুফ মিয়াসহ অনেকেই জানান, তারা অন্যের জমি তিন বছর মেয়াদী অস্থায়ী বন্দোবস্ত (লিজ) নিয়ে লেবু বাগান করেছিলেন।

লেবু বাগানে দীর্ঘদিন বন্যার পানি জমে থাকায় প্রথমে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝড়ে পরেছে। বাধ্য হয়ে তারা গাছের ছোট-বড় সব লেবু তুলে কমদামে বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে ধীরে ধীরে গাছগুলোও মরে গেছে। এর ফলে তারা পুঁজি হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন।

লাউহাটী ছয়আনী পাড়া গ্রামের লেবু চাষি হুমায়ুন কবীর জানান, এক সময় তিনি নিঃস্ব ছিলেন। অন্যের লেবু বাগানে দিনমজুরের কাজ করতেন। ধীরে ধীরে টাকা জমিয়ে ১০ বছর আগে তিনি ১.২০ একর ভূমি বন্দোবস্ত (লিজ) নিয়ে লেবু বাগান করেছিলেন। ওই লেবু বাগানের আয় দিয়ে তিনি পরিবারের খরচ মিটিয়ে দুই ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছেন।

তার বড় ছেলে মো. আল-আমিন এইচএসসি পরীক্ষার্থী, অপর ছেলে মিজানুর রহমান সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বন্যায় তার লেবু বাগান পুরোপুরি ধংস হয়ে গেছে। ফলে ছেলেদের পড়ালেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বর্তমানে এলাকায় দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

Tangail-Lemon-1

স্থানীয় পুটিয়াজানী বাজার, লাউহাটী বাজার, ফাজিলহাটী বাজার, কেদারপুর বাজারের পাইকারি লেবু ব্যবসায়ী মিনহাজ মিয়া, মো. রাশেদুল আলম, মো. আয়নাল খানসহ অনেকেই জানান, বন্যার পানি আসার সময় বাগান মালিকদের কাছ থেকে তারা কমদামে লেবু কিনে ঢাকা, বরিশাল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেছেন।

বন্যায় বাগান ধংস হওয়ায় বর্তমানে লেবু পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাজারে দাম বেড়েছে লেবুর। আগে যে বস্তা লেবু দুই হাজার টাকায় কিনতেন তা এখন পাঁচ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে, এরপরও লেবু পাওয়া যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপ-পরিচালক মো. আহসানুল বাশার বলেন, লেবুকে এখনও কৃষি বিভাগ ফসল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সেজন্য লেবু খাতে কৃষি মন্ত্রাণালয়ের কোনো বরাদ্দ নেই।

লেবুর চারা রোপণ থেকে ফল উৎপাদন পর্যন্ত সাধারণত তিন বছর সময় লাগে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগতে পারে বলেন ধারণা তার।

তিনি আরও জানান, এবারের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লেবু চাষিদের মাঝে চারা বিতরণের লিখিত প্রস্তাবনা তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন।

এমএমএফ/এএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]