ইউরিয়া সার ব্যবহার করে খড় সংরক্ষণের উপায়

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৫৮ পিএম, ২৩ নভেম্বর ২০২১

আমাদের দেশের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ বিভিন্নভাবে পশুসম্পদের সাথে জড়িত। বিশাল এই পশুসম্পদের খাদ্য হিসেবে এদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ থেকে ২ কোটি টন ধানের খড় উৎপাদিত হয়। এর শতকরা ৪০ ভাগ উৎপাদিত হয় বর্ষা মৌসুমে।

এ সময়ে বোরো ও আউশ থেকে উৎপাদিত প্রায় ৮০ লাখ টন খড় বৃষ্টি জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য কারণে শুকানো যায় না, ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়। এই পরিমাণ খড়ের বর্তমান বাজার দর কমপক্ষে ৮০ কোটি টাকা। একদিকে এত বিপুল পরিমাণ খড় প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে দেশের গোখাদ্যের চাহিদা শতকরা ৪৪ ভাগই অপূরণীয় থাকছে।

তাছাড়া আমন মৌসুমে উৎপাদিত খড় শুকাতে কৃষকদের প্রচুর শ্রম, অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে ধানের খড়কে তাজা ও ভেজা অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়।

খড় ভিজে গেলে ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট, ফাংগি তার পুষ্টি গ্রহণ করে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই জীবাণুগুলো এবং তাজা খড়ে বিদ্যামান বিশেষ ধরনের এনজাইম খড়কে দ্রুত পচিয়ে ফেলে। পরে খড় কালো নরম গোবরের মতো হয়ে যায়, যা গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তবে কেবল কমপোস্ট বা জৈবসার হিসেবে জমিতে ব্যবহৃত করা যায়।

ইউরিয়া দিয়ে ভিজিয়ে খড় সংরক্ষণ করা যায়। এই পদ্ধতিতে খড় সংরক্ষণ সবচেয়ে সহজ এবং এর সুবিধাজনক দিক হচ্ছে, ইউরিয়া খড়ের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করে, ইউরিয়া সহজলভ্য ও তুলনামূলক দাম কম এবং এ পদ্ধতি সহজ ও নিরাপদ।

যে স্থানে খড় সংরক্ষণ করা হবে প্রথমে সে স্থানে পুরানো খড়কুটা বা পুরানো পলিথিন বিছাতে হবে। এরপর এক স্তর ভেজা খড় যেমন, ২৫ কেজি খড় বিছাতে হবে। এই পরিমাণ খড়ের জন্য ৩৫০-৫০০ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া ছিটিয়ে দিতে হবে।

এভাবে স্তরে স্তরে খড় এবং ইউরিয়া ছিটিয়ে খড়ের গাদা তৈরি করতে হবে। খড়ের গাদার আকার খাঁড়া গম্বুজাকার না হয়ে চওড়া হবে। যখন সম্পূর্ণ খড় শেষ হবে তখন খড়ের গাদাকে এমনভাবে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে খড়ের গাদায় কোনো বাতাস ঢুকতে বা বের হতে না পারে।

পলিথিনের কিনারাগুলো মাটি দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিতে হবে। অধিক পরিমাণ খড়ের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যখন খড়ের গাদার আকার বড় হয়, সেক্ষেত্রে দুই টুকরো পলিথিনকে প্রস্থ বরাবর জোড়া দিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পলিথিনে যাতে কোনো বড় ধরনের ছিদ্র না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

অতিরিক্ত পানিযুক্ত খড়ের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে ৩-৪ স্তর পরপর এক স্তর শুকনো খড় দিলে খড়ের সংরক্ষণ ভালো হয়। সাধারণত বিভিন্ন জমির ধান বিভিন্ন সময়ে কাটা হয়। এক্ষেত্রে যতটা সম্ভব এক সাথে সব খড় সংরক্ষণ করা সবচেয়ে উত্তম।

তবে কিছু পরিমাণ খড় ইউরিয়া দিয়ে বায়ুরোধী অবস্থায় সংরক্ষণের পর সেখানে নতুন ভেজা খড় যোগ করতে হলে গাদার পলিথিন সরিয়ে প্রথমে কিছু পরিমাণ (৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম, গাদার আকারের উপর নির্ভর করে) ইউরিয়া ছিটিয়ে দিতে হবে এবং স্তরে স্তরে খড় ও ইউরিয়া দিতে হবে। সব শেষে খড়ের গাদাকে পলিথিন দিয়ে বায়ুরোধী অবস্থায় ঢেকে দিতে হবে।

সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত খড় এক বছরের অধিক সময় সংরক্ষণ করা যায়। সংরক্ষণের দুই সপ্তাহ পর থেকে যেকোনো সময় ইচ্ছা করলে খড় গাদা থেকে বের করে গরুকে খাওয়ানো যায়।

গাদা থেকে বের করা সংরক্ষিত খড়ে প্রচুর পরিমাণে অ্যামোনিয়া থাকে। খোলা বাতাসে আধাঘণ্টা পরিমাণ সময় রেখে দিলে অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া চলে যায়। এরপর উক্ত সংরক্ষিত খড়কে শুকনো খড় বা কাঁচা ঘাসের সাথে মিশিয়ে গরুকে খাওয়ানো যায়। গরু সাধারণত সংরক্ষিত খড় পছন্দ করে তাই খাওয়াতে অসুবিধা হয় না। সংরক্ষিত ভেজা খড়কে পুনরায় শুকানোর প্রয়োজন নেই এবং এতে খড়ের পুষ্টিমান কমে যায়।

ইউরিয়া ভেজা খড়কে সংরক্ষণের পাশাপাশি এর পুষ্টিমানও বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সংরক্ষিত খড়ের প্রোটিন, বিপাকীয় শক্তি, পাচ্যতা এবং খাদ্য গ্রহণ শুকনো খড়ের তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণত শুধু শুকনো খড় খাওয়ালে একটি বাড়ন্ত গরু দৈনিক প্রায় ৩৭৯ গ্রাম হারায় কিন্তু শুধু সংরক্ষিত খড় খাওয়ালে দৈনিক প্রায় ২৮০ গ্রাম ওজন বৃদ্ধি পায়। সংরক্ষিত খড়ের পুষ্টিমান শুকনো খড়ের তুলনায় ১.৪ গুণ বেশি।

এক্ষেত্রে ইউরিয়া এবং পলিথিনের খরচই প্রধান। বর্তমান বাজার দর হিসেবে ৫ টন খড়ের সংরক্ষণ খরচ মাত্র ৮৫৫ টাকা। যেখানে প্রতিবছর প্রায় ৮০ লাখ টন খড় বৃষ্টি জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য কারণে শুকানো যায় না, ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতি হয় কমপক্ষে ৮০ কোটি টাকা।

ইউরিয়া সংরক্ষণপদ্ধতি বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ খড়ের শুধু পচন রোধই করে না, এর খাদ্যমানও বৃদ্ধি করে। এছাড়াও এই সংরক্ষণ পদ্ধতি কৃষকের শ্রম, সময় এবং সেই সাথে অর্থেরও সাশ্রয় হবে। পশু নিয়মিত খাবার পাবে।

এমএমএফ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]