পাট ও পাট জাতীয় আঁশ

ভিসকোস তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও করণীয়

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৯ পিএম, ২৩ মার্চ ২০২৩

ড. মো. নুরুল ইসলাম

ঐতিহ্যবাহী পাট ও পাটশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এবং রাখছে। পাটের উপযোগিতা বৃদ্ধির জন্য পাট থেকে মূল্য সংযোজিত বহুমুখী পণ্য তৈরির বিকল্প নেই। পাটকে কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি করলে যে পরিমাণ অর্থ আয় করা যায়, মূল্য সংযোজন করে তার চেয়ে প্রায় ৩০-৪০ গুণ বেশি আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ টন পাট উৎপন্ন হয়। যার বেশিরভাগই ব্যবহৃত হয় পাটকলে প্রচলিত পণ্য তৈরির কাজে।

পাটের মূল্য সংযোজিত পণ্য ভিসকোস
পাটকে টিকিয়ে রাখতে হলে আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে বহুমুখী মূল্য সংযোজিত পাটপণ্য তৈরির কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাঠ থেকে ভিসকোস তৈরি করা হয়। ভিসকোস অত্যন্ত উন্নতমানের সুতা। পাটকে কাঠের বিকল্প উৎস হিসেবে ভিসকোস তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। পাটের আঁশে ৫৮-৬৫% সেলুলোজ আছে। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পাট থেকে উন্নতমানের ভিসকোস তৈরি করা সম্ভব।

বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্পে ব্যাপক পরিমাণে ভিসকোস ব্যবহার করা হয়, যার পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ভিসকোস ও অন্য ম্যানমেইড আমদানি করে। পাট থেকে বাণিজ্যিকভাবে ভিসকোস তৈরি করলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এছাড়া দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে ভিসকোস রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

আরও পড়ুন: পাটের আঁশ সংগ্রহের নতুন কৌশল 

ভিসকোস ফাইবারের বৈশিষ্ট্য
কাঠ গাছের পাল্পকে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও কার্বন ডাই সালফাইড ব্যবহার করে প্রাপ্ত তরল সেলুলোজকে রিজেনারেট করে ভিসকোস ফাইবার প্রস্তুত করা হয়। এটি অত্যন্ত নরম, উজ্জ্বল, পানি ও ঘাম শোষণকারী, আরামদায়ক, হালকা, বিভিন্ন রং করার উপযোগী, তুলা, পলিয়েস্টার ও অন্য ফাইবারের সঙ্গে ব্লেন্ড উপযোগী দীর্ঘস্থায়ী ফাইবার।

ভিসকোস থেকে তৈরিকৃত পোশাক পচনশীল হওয়ায় তা পরিবেশবান্ধব ও মানুষের পরিধানের জন্য অন্য সিনথেটিক ফাইবারের চেয়ে অনেক উপযোগী। ১৯১০ সালে আমেরিকার অ্যাভেটেক্স ফেবারসিনক কোম্পানি প্রথম ভিসকোস ফাইবার উৎপাদন করে। যে গাছে সেলুলোজ থাকে, ওই গাছ থেকে ভিসকোস তৈরি করা সম্ভব। যেমন- কাঠ, বাঁশ, তুলা, পাট, কেনাফ, ব্যানানা ও আনারস ফাইবার, আখের ছোবড়া ইত্যাদি।

সাধারণত কাঠ থেকে ভিসকোস তৈরি করা হয়। কাঠের মধ্যে যে সেলুলোজ আছে, তা পাটেও আছে। কাঠ গাছ পূর্ণ হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। অপরদিকে পাট গাছ প্রতি বছর জন্মে এবং অল্প সময়ে কাঠের তুলনায় এর সেলুলোজ পূর্ণতা পায়। তাই পাট থেকে ভিসকোস ফাইবার তৈরি করলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী বনজ সম্পদের ওপর চাপ কমবে। যেহেতু বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় পাট উৎপাদনকারী দেশ, তাই পাট থেকে ভিসকোস তৈরি করলে বিশ্ববাজারে পাটের ভিসকোসের প্রচুর চাহিদা হবে বলে আশা করা যায়।

আরও পড়ুন: মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পাট 

দেশ-বিদেশে ভিসকোস ফাইবারের চাহিদা
শ্রমিক মজুরি বেশি হওয়ায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো এবং বর্তমানে চীন থেকেও গার্মেন্টস শিল্প এশিয়া মহাদেশের অন্য দেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলোয় ফাইবারের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত নিজস্ব উৎপাদিত সুতা নিজস্ব গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশ্বের মোট তৈরিকৃত বস্ত্রের ৩৫ ভাগ হয় কটন থেকে এবং ৬৫ ভাগ হয় সিনথেটিক সুতা থেকে। কটনের উৎপাদন দিন দিন কমে গেলেও এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিসকোস কটনের মতোই ১০০% সেলুলোজ জাত ও আরামদায়ক ফাইবার।

বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা মূল্যের কটন ফাইবার এবং প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ম্যানমেইড সিনথেটিক ফাইবার আমদানি করে। এর প্রায় ৩০-৩৫ হাজার মেট্রিক টন ভিসকোস আমদানি হয়, যার মূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে ভিসকোস উৎপাদনে চীন প্রায় ৬৫% স্থান দখল করে আছে। আমদানিকৃত ভিসকোসের প্রায় ৮০ ভাগ আমদানি হয় চীন থেকে এবং বাকি আমদানি হয় ভারত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে।

বাংলাদেশে যে পাট উৎপাদন হয়, তা দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ভিসকোস সুতা তৈরি করে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ পাট থাকায় এ খাতে সাফল্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে পাট থেকে ভিসকস সুতা উৎপাদন করা গেলে প্রতি বছর প্রায় হাজার কোটি টাকা আমদানি সাশ্রয় হবে।

আরও পড়ুন: চৈত্র মাসে পাট চাষে করণীয় 

উপসংহার
পাট থেকে ভিসকোস উৎপাদন করা গেলে টেক্সটাইল শিল্পে মূল্য সংযোজন ১০০% করা সম্ভব। এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের একটি মাইলফলক। এ শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও এর অর্থনৈতিক দিকসমূহ বিবেচনা করে সরকারি অর্থায়নে বা পিপিপি বা যৌথ উদ্যোগে একটি প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাট ও পাট জাতীয় আঁশ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং পাটের ব্যবহারে নতুন আরেকটি মাইলফলক উন্মোচিত হবে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের রসায়ন বিভাগের বিজ্ঞানীগণ পাট থেকে ভিসকোস তৈরি করার জন্য কাজ করছে।

লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট।

এসইউ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।