এবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ইয়াংঘি লি’র কাছে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব পেতে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়া বালুখালী বস্তিতে আশ্রয় নেয়া নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। এটি নিশ্চিত করা গেলে তারা নিজ জন্মভূমি মিয়ানমার ফিরে যেতে চান বলে উল্লেখ করেছেন। মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়ায় নতুনভাবে গড়ে ওঠা বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়ে নির্যাতিতদের সাথে কথা বললে মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে এসব দাবি তুলে ধরেন নিপীড়িতরা। এর আগে ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা রাখাইন কমিশনকেও একই দাবি করেছিলেন রাখাইন স্টেটে নিপীড়িতরা। এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বালুখালী অনিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্প মাঝি খলিল বলেন, মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ইয়াংঘি লি বালুখালী ক্যাম্পে আসেন। এসে তিনি তার বাসায় অবস্থান নিয়ে নির্যাতিতদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তখন রাখাইন স্টেটে সম্প্রতি মিয়ানমার সেনা-পুলিশের শারীরিক নির্যাতনের শিকার খতিজা বেগম, হাজেরা খাতুন, আনোয়ারা বেগম, তৈয়বা আকতার ও ছমুদাসহ ২০-২৫ নারীর সঙ্গে কথা বলেন। তাদের ওপর মিয়ানমার সেনা-পুলিশ ও মগ যুবকদের পালাক্রমে চালানো পৈশাচিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনেকে কেঁদে ফেলেন। নিপীড়ন কালে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত পোয়াখালীর আবুল বশর, নুরুল ইসলাম, জহির আহমদসহ ২০ জন নির্মম হত্যার দৃশ্যাবলীর বিবরণ দেন লিখে। নিজ দেশে অবর্ণনীয় নির্যাতনের কাহিনী মনোযোগ দিয়ে শুনেন ইয়াংঘি লি। পোয়াখালীর ওক্কাট্টা (চেয়ারম্যান) আবুল ফয়েজও তার গ্রামের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে ৩৬ ধর্ষিতা ও ৪২ জন গুলিবিদ্ধ গ্রামবাসীর তালিকা ইয়াংঘি লি’র হাতে তুলে দেন। খলিল মাঝি আরও জানান, বর্ণনা শুনে স্তব্ধ হয়ে যান জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার। বাংলাদেশে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হওয়া রোহিঙ্গাদের সাধুবাদ জানান তিনি। এ সময় ইয়াংঘি লি তাদের দেয়া লিস্ট ও মৌখিক বর্ণনা তার সংস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চিতেও যথা সম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চেষ্টা চালাবেন বলে কথা দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী অর্ধশত নিপীড়িত রোহিঙ্গার সাথে কথা বলে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াংঘি লি ক্যাম্পের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে বস্তির রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন অবলোকন করেন। এ সময় তাদের ভবিষ্যত চাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আশ্রিত রোহিঙ্গারা, নাগরিকত্ব নিজ দেশেই ফিরতে চান বলে জানান। মৌলভী জাফর আলম, মুহাম্মদ আয়ূব, মুহাম্মদ নূর ও আনোয়ার কামাল বলেন, মিয়ানমারে ১৪৭ জাতের মধ্যে রোহিঙ্গা ছাড়া বাকি সবার নাগরিকত্ব রয়েছে। এ কারণে যুগ যুগ ধরে তারা নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা। নিজ জন্মভূমি হলেও পরবাসীর মতোই জীবন কাটাতে হয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের। কারণে-অকারণে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলে আসা নির্যাতন তাদের মাঝে একটি। ‘অপারেশন ক্লিন’ চালাতে পুলিশ ক্যাম্পে দুর্বৃত্ত হামলার ঘটনাটি পরিকল্পিত বলেই মনে করছেন তারা। এর সূত্র ধরে রোহিঙ্গাদের ভোগদখলীয় জমি দখল, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, হত্যা-গুম ও নারীদের গণধর্ষণ করে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। জীবন বাঁচাতে তারা সীমান্তবর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় পেলেও এখানে থেকে যেতে চান না। নাগরিক ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব মিয়ানমার ফিরে যেতে চান তারা। বিকেল পৌনে ৪টায় শরণার্থী ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশ্যে উখিয়া ত্যাগ করেন ইয়াংঘি লি। এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব বাকি বিল্লাহ, আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থার সৈকত বিশ্বাস, জেলা প্রশাসনের পক্ষে উখিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূর উদ্দিন শিবলী ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন। সায়ীদ আলমগীর/এএম/জেআইএম