বাংলাদেশ তথা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ জামদানি শিল্পের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের একমাত্র জামদানি শিল্পনগরী বিসিক জামদানি শিল্পনগরী। ১৯৯৩-১৯৯৯ সময়কালে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার অদূরে নারায়গঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার নোয়াপাড়ায় ২০ একর জমির উপর বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)এর তত্বাবধানে এই জামদানি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও যে উদ্দেশ্য নিয়ে জামদানি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার ১০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসনের নানা অনিয়ম আর অবৈধ দখলদারদের প্লট দখলের কারণে এই শিল্পনগরী সফলতার মুখ দেখেনি আজো। শনিবার সকালে জামদানি বিসিক শিল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ৪০৬টি প্লটের মধ্যে ৩৫০টিরও অধিক প্লট শুধু আবাসনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এগুলোতে কোন তাঁত বুনা হয়না। কিছু কিছু প্লট বিভিন্ন কলকারখানার অফিস আবার কিছু প্লট শ্রমিকদের থাকার মেস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধারণ ক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ লোকের বসবাস এখানে। এজন্য পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। রাতের বেলায় এখানে মাদকসেবীদের আসর বসে। বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপেরো অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে যে, স্থাপনাগুলো বিসিক কর্তৃক প্রদত্ত মডেল অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি। ১৫০০ বর্গফুট জায়গায় একসাথে ৫/৬ টি পরিবার বসবাস করেন। শিল্পনগরীর রাস্তা ও ড্রেন জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। অধিক সংখ্যক লোকের বসবাসের কারণে ড্রেনগুলো ময়লায় ভর্তি, পানি নিষ্কাশন ঠিকমত হচ্ছে না। রাস্তায় ময়লা পানি জমে আছে যা থেকে বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বরাদ্দপ্রাপ্ত জামদানি তাঁতি যারা এখনো জামদানি তাঁতের সঙ্গে জড়িত তারা এসব অরাজক ও অনিয়মের জন্য বিসিকের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। বিসিক জামদানি শিল্প প্লট মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি হাজী মো.আনিসুজ্জামান খোকন এই অরাজক পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে স্থানীয় ও বিসিক প্রশাসনের সহযোগিতায় এই অরাজক পরিস্থিতির আশু সমাধান চান এবং শুধু জামদানি শিল্পের জন্য এই শিল্পনগরীকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য কাজ করবেন বলে জানান। বিসিক থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, এখানে ২ ধরনের ৪১৬টি প্লট রয়েছে যা শুধুমাত্র জামদানি তাঁতিদের মাঝে বরাদ্দযোগ্য। এ টাইপ ৩৫৪টি প্রতিটি ১৫০০ বর্গফুট করে আর এস টাইপ ৬২টি বিভিন্ন আকারের। ৪০৬টি প্লট বিভিন্ন সময়ে ৬০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে নামমাত্র মূল্যে জরিপের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত জামদানি তাঁতিদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হয় যা ১০ বছরে ১০টি সমান কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। বরাদ্দপত্রের নিয়ম মতে এই প্লট বরাদ্দপ্রাপ্ত তাঁতি বিসিকের অনুমতি ব্যতীত অন্য কারো কাছে বিক্রি কিংবা হস্তান্তরের বিধান না থাকলেও দরিদ্রতার কারণে অধিকাংশ তাঁতিই তাদের প্লট অবৈধভাবে অন্য পেশার মানুষদের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করেছেন যা আইনত দণ্ডনীয়। অবৈধ ক্রেতাগণ এখন প্লটগুলো শুধু আবাসনের কাজেই ব্যবহার করছেন। পারিবারিক কুটির শিল্পের অংশ হিসেবে এসব প্লটে তাঁতিদের জামদানি বোনার পাশাপাশি আবাসনেরও সুবিধা আছে। এই সুযোগেই অবৈধ ক্রেতারা বসবাস করছেন। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সুবিধা আছে এখানে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ ক্রেতারা এই শিল্পনগরীকে পুরোপুরি আবাসিক এলাকায় পরিণত করেছেন। প্লট দখলের অভিযোগ সত্যি কী না জানতে চাইলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁতিরা জানান, বিসিকের অফিস সহকারী আবদুল হকের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এ ব্যাপারে আবদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, প্লট বরাদ্দে অনিয়ম হয়েছে এটা ঠিক না। গরিব তাঁতিরা প্লট পেলেও তারা ঘর তুলতে না পেরে বিক্রি করে দেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিসিক কার্যালয়ের সামনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্লটগুলো অবৈধভাবে দখলে নিয়ে স্থানীয় রশিদ মিয়া, জয়নাল মিয়া, সোহরাব মাস্টার, হযরত আলী, রহমান মিয়া, আলী আলম, মোখলেস মিয়া টেক্সটাইল মিল করেছেন। এছাড়া তারাব পৌরসভার নারী কমিশনার জ্যোৎস্না বেগম, মিল ব্যবসায়ী নুরু হাজি, গাড়ি ব্যবসায়ী নুরে আলম, টেক্কু মিয়াসহ আরো অনেকে অবৈধভাবে প্লট দখলে নিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। জামদানি তাঁতি হিসেবে জানান দিতে কেউ কেউ নামমাত্র বাঁশ-খুঁটি পুঁতে রেখেছেন। অনেক তাঁতি প্লট না পেয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আউয়াল আলী নামের এক তাঁতি ক্ষোভের সঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, কাগজপত্র জমা দিছি। অথচ প্লট পাই নাই। হেই প্লট পাইছে এক ব্যবসায়ী। নুরুল আমিন গত ১১ বছর ধরে ভাড়ায় তাঁত চালিয়ে আসছেন। অথচ তার কপালেও জোটেনি প্লট। নুরুল আমিন বলেন, আমরা প্রকৃত তাঁতি অইয়াও প্লট পাই না। আর যেরা তাঁতি না হেরা প্লট পায়।জামদানি শিল্পনগরী, বিসিক এর সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পনগরী কর্মকর্তা জনাব মো. মামুনুর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে জানান, অতীতে বিসিকের লোকবল সঙ্কট ও অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ও সুবিধাভোগী লোকজন জামদানি শিল্পের পরিবর্তে শুধু বসতি স্থাপন করে বসবাস করছেন। এ ব্যাপারে বিসিক প্রাশাসন বেশ সচেতন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যেই অবৈধভাবে দখলকৃত ৪৯টি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই বিসিক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এই প্লটগুলো বিসিকের দখলে আনার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরো বলেন, পর্যায়ক্রমে অবৈধভাবে দখল করা সকল প্লট বিসিকের দখলে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং প্রকৃত জামদানি তাঁতিদের মাঝে এইসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হবে। এই শিল্পনগরী শুধুমাত্র জামদানি শিল্পীদের আবাসন ও তাঁত বুনার জন্য ব্যবহৃত হবে। অন্য কারো আবাসনের জন্য নয়। এই ব্যাপারে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন। অতি প্রাচীনকাল থেকে জামদানি শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অংশ হলেও বর্তমানে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ইউনেস্কো জামদানিকে বিশ্বসভ্যতার স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় স্থান দেয়। তাই বাংলাদেশ তথা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এই জামদানি শিল্পের প্রচার ও প্রসারের জন্য বাংলাদেশের একমাত্র জামদানি শিল্পনগরীকে দখলদারদের কবল থেকে দখলমুক্ত করে প্রকৃত জামদানি শিল্পীদের পুনর্বাসন করা অতীব জরুরি বলে অনেকে মনে করেন। মীর আব্দুল আলীম/এমজেড/আরআইপি