সনদ থাকার পরও স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি তোফাজ্জল হোসেন। পারিবারিক দৈন্যদশায় তিনি স্বাধীনতার পর থেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিয়েছেন টিউশনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশিক্ষণ সনদপত্র, প্রত্যয়নপত্র ও পরিচয়পত্র নিয়ে স্বীকৃতি পেতে আজও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
মানবেতর জীবন-যাপনকারী ৬৪ বছর বয়সী এ মুক্তিযোদ্ধার আকুতি, মরণের আগে যেন তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু দেখে যেতে পারেন। তিনি জেলার মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের বয়ড়া গ্রামের মৃত আয়েজ উদ্দিন মন্ডল এবং মা মৃত কায়জান বেওয়ার চতুর্থ সন্তান। বতর্মানে সপরিবারে নওগাঁ শহরের খাঁস-নওগাঁ মহল্লায় বসবাস করছেন।
জানা যায়, ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তোফাজ্জল হোসেন চতুর্থ। গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় অবশেষে আর পড়াশুনা চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। পরিবারকে সহযোগিতা করার জন্য বাবার সঙ্গে শ্রমিকের কাজ করতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে পাড়ার যুবকরা মিলে নিয়মিত রেডিও শুনতেন।
১৯৭১ সালে চারদিকে যুদ্ধের ডামডোল চলছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করতে লোক নেয়া হচ্ছে। এলাকার অবস্থা তেমন সুবিধাজনক না হওয়া বাবা-মা ও বড় ভাই পরামর্শ দেয় ভারতে যাওয়ার জন্য। নিজের ও পরিবারের কথা না ভেবে ১৭ বছরের ওই যুবক পাড়ি জমান ভারতে। ভারতের ৭নং হিলি সেক্টর মধুপুর থেকে পতিরাম, পরে শিলিগুড়িতে হায়ার ট্রেনিং নেন। সেখানে চার সপ্তাহের ট্রেনিংয়ে সংক্ষেপে যুদ্ধের কলাকৌশল শিখে নেন। তার ব্যাচে ছিল ৩০ জন যোদ্ধা। সেখানে ট্রেনিং অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন এস.এইচ বারি এবং ক্যাম্প ইনচার্জ মহিউদ্দিন আহমেদ পরিচালনা করতেন। ট্রেনিং শেষ করে মধুপুর থেকে কামারপাড়া যান অস্ত্র নেয়ার জন্য।
যুদ্ধের জন্য এরপর চলে আসেন নওগাঁয়। সদর উপজেলার কৃর্ত্তিপুর-মাগুরা ও কুচগাড়ী এলাকার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন নভেম্বর মাসে। তার গ্রুপে ১৭ জন যোদ্ধা ছিল। টিম লিডার ছিলেন আব্বাস আলী এবং ফিরোজ হোসেন। তারা দুজনেই মারা গেছেন। এলাকার লোকজন তাদের খাবার সরবরাহ করতেন। আর মেলেটারিরা ক্যাম্প করেছিল জেলার বদলগাছী থানায়। মুক্তিযোদ্ধারা যে এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল মেলেটারিরা সেটার খবর পেয়ে যায়। তাদেরকে আটক করার জন্য নভেম্বর মাসের শেষের দিকে বদলগাছী থেকে নওগাঁর দিকে আসছিল। মুক্তিযোদ্ধারা বদলগাছী-নওগাঁ সড়কের শষীর মোড়ে মাটির রাস্তায় দুটি মাইন পুতে রেখে তা দূর থেকে দেখছিলেন। মেলেটারিদের গাড়ির চাকা মাইনের উপর উঠামাত্র তা বিষ্ফোরণ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ৬ জন মেলেটারি মারা যায়। আর আহত কয়েকজনকে পরে মেলেটারিরা এসে নিয়ে যায়।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে নওগাঁ শহরে চলে আসেন তোফাজ্জল হোসেন। এরপর ১৯৮৭ সালে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন তিনি। শহরের খাস-নওগাঁতে বসবাস করছেন। সেখানে ১ম-৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাইভেট পড়ান। নাম দিয়েছেন ‘খাস-নওগাঁ প্রাইভেট হোম’। বছরের ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই তিন মাস প্রাইভেট থাকে না। ফলে কষ্ট করে দিনাতিপাত করতে হয়। এক ছেলে আলফা আলামিন ইথার। পড়াশুনা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
২০১০ সালে ১৯ মে তত্বাবধায়ক সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই তালিকায় তার সিরিয়াল ছিল ৪০৫ নম্বর। তার সঙ্গে সহযোদ্ধারা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। সরকারের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। অনেকে মারা গেছে। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে শুধু বাদ পড়েছেন তোফাজ্জল হোসেন। অথচ মুক্তিযোদ্ধার প্রমাণ স্বরুপ প্রশিক্ষণ সনদপত্র, প্রত্যয়নপত্র ও পরিচয়পত্র থাকার পর মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হতে পারেননি।
তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সরকার চেষ্টা করছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করছে। কিন্তু হাইব্রিড মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করতে দেরি হলেও সক্ষম হবে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই হয়। সেখানেও টাকার খেলা হয়েছে। যে টাকা দিতে পেরেছে তাকে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরও তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। আবার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা টাকা দিতে না পারায় সব কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্বেও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার কাছ থেকেও এক লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা দিতে রাজি হইনি। যাচাই বাছাইয়ের দিনে আমার জলজ্যান্ত সাক্ষীদের কাছ থেকেও সাক্ষ্য নেয়া হয়নি। তাদেরকে সাক্ষ্য দিতে নিষেধ করা হয়েছে। ফলে আমার নাম তালিকাভুক্ত হয়নি।
স্ত্রী বেনুয়ারা বেগম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। ভাবছিলাম হয়তো চূড়ান্ত যাচাই বাছাইয়ে স্বামীর নামটা তালিকাভুক্ত করা হবে। কিন্তু তালিকাভুক্ত না হওয়ায় আমরা মর্মাহত হয়ে পড়েছি। যারা জেলায় দায়িত্বে আছেন ইচ্ছে করলেই নামটা কাগজে তুলে দিতে পারেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নওগাঁ জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার হারুন-অল-রশিদ বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর হলেও আমরা স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছি। এতদিন সেখান থেকেও তো বঞ্চিত ছিলাম। আগামী দিনে আমাদের সম্মান হয়তো আরও বাড়ানো হবে। যারা এখনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি তাদেরকেও আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।
আব্বাস আলী/এমএএস/এমএস