দেখতে কিছুটা ময়ূরের মতো। নিজের রূপের বহিপ্রকাশ ঘটাতে মাঝে মধ্যে ময়ূরের মতো পেখম মেলে ঘুরে বেড়ায়। এক সঙ্গে সবাই ডাকাডাকি করে। খুবই শান্ত প্রকৃতির প্রাণি। প্রাণিটির নাম তার্কি। তার্কি মুরগি নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশে এ নামটি খুব বেশি পরিচিত না হলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে এ জাতের মুরগির বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। ঝুঁকি ও ঝামেলা কম হওয়ায় নওগাঁয় বেকার ও শিক্ষিত যুবকরা এখন তার্কি পালনে আগ্রহী হচ্ছেন।
জেলার মহাদেবপুর উপজেলার ভবানীনগর গ্রামের তার্কি খামারি নয়ন। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। চাকরি ছেড়ে গ্রামে চলে আসেন। এরপর বাড়িতে খামার করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা থেকে গত ৫ মাস আগে ঢাকা থেকে এক মাসের ৫০টি তার্কি বাচ্চা, ১২টি তার্কি মুরগি এবং ৪টি মোরগ দিয়ে খামার তৈরি করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট বড় সবধরনের তার্কি মুরগি খামারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খামারের পাশে ঘুরে ঘুরে সবুজ ঘাস খাচ্ছে। পাশেই সংগ্রহ করে রাখা কলমি শাক ছোট ছোট করে কাটছিলেন খামারি। তার্কি মাঝে মধ্যে ময়ূরের মতো পেখম মেলছে এবং একসাথে সবাই ডাকাডাকি করছে। দেশি মুরগির চেয়ে তার্কির রোগ-বালাই একবারেই কম। এছাড়াও খাবারের খরচও কম। বাড়তি খাবার বাজার থেকে কিনতে হয় না। প্রকৃতিতে এদের খাবার পাওয়া যায়। অবশ্য দানাদার খাবারের চেয়ে কলমি শাক ও বাঁধাকপিই বেশি পছন্দ করে এ জাতের মুরগি।
একটি বাচ্চা তার্কি ৫-৬ মাস পালনের পর ডিম দেয়া শুরু করে। ৬ মাসে ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৭-৮ কেজি। প্রতিটি তার্কি পালনে খরচ হয় ৭০০-৮০০ টাকা। আর বিক্রি হয় ন্যূনতম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মুরগিতে লাভ আসে প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা।
খামারি নয়ন জানান, দেড় মাস থেকে সমন্বিত খামার তৈরি করার কাজ করছেন। নাম রাখবেন ‘চিশতিয়া খামারবাড়ী’। যেখানে গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগি থাকবে।
তিনি বলেন, এলাকার লোকজনের তার্কি মুরগির বিষয়ে তেমন ধারণা নেই। যারা দেখতে আসেন তাদের তার্কি বিষয়ে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি। এখন প্রতিদিন ৪টি করে ডিম পাচ্ছি। প্রতি হালি ডিম ৮০০ টাকায় বিক্রি করছি। বাচ্চা ফুটানোর জন্য অনেকে নিয়ে যাচ্ছেন। নিজেও দেশীয় পদ্ধতিতে বাচ্চা ফুটানোর চেষ্টা করছি। তবে তার্কি সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। যখন সরবরাহ বেশি হবে তখন দামও কমে আসবে। সবাই পালনের আগ্রহ দেখাবে। এটি উৎপাদনের মূল লক্ষ্যটা হচ্ছে মাংস।
নয়নের স্ত্রী তানজিলা বলেন, তার্কি মুরগি কলমি শাক, বাঁধাকপি, ভুট্টা, চাল, ভাতসহ অন্যান্য খাবার খায়। তবে দানাদার খাবারের চেয়ে কলমি শাক ও বাধাকপিই বেশি পছন্দ। পালনের জন্য খুবই সুবিধা। রোগ বালাইও কম। গরু, খাসি ও দেশী হাঁস-মুরগীর চেয়ে এই তার্কির মাংসের স্বাদ বেশি ও চর্বির পরিমাণ কম। আবার রান্নাও হয় অল্প সময়ের মধ্যে।
নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. উত্তম কুমার দাস বলেন, তার্কির মাংস থেকে পুষ্টি ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। আর এই পুষ্টির উৎস হিসেবে তার্কির গুরুত্ব মুরগি ও হাঁসের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। এটি একদিকে যেমন পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে। অন্যদিকে বেকারদের বেকারত্ব দূর করছে। তাই তার্কি মুরগি পালন দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। যদি কেউ তার্কি খামার করতে চায় তাহলে তাদের কারিগরী সুযোগ-সুবিধা ও পরামর্শ দেয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এ জেলায় প্রায় ৫০টির মতো তার্কি মুরগির খামার আছে। তার্কি মুরগি বিদেশি হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ লক্ষ্য করা গেছে। তাই তার্কি পালন করে খুব সহজেই নিজের ভাগ্য বদলানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আব্বাস আলী/আরএআর/এমএস