জাতীয়

গ্লোবের করোনা টিকা গরিব মানুষও কিনতে পারবেন

বাংলাদেশি প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে করোনাভাইরাসের টিকা (ভ্যাকসিন) আবিষ্কারের দাবি করেছে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। তারা বলছে, প্রতিবন্ধকতার শিকার না হলে আগামী ডিসেম্বরে বাজারে টিকা আনতে পারবেন। প্রথম ধাপে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টিকা উৎপাদন করবেন তারা।

টিকা আবিষ্কারের বিস্তারিত বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি অপারেশন্সের ম্যানেজার ও ইনচার্জ এবং টিকা আবিষ্কারের গবেষক দলের সদস্য মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। সাক্ষাৎকারটি জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

জাগো নিউজ : টিকা আবিষ্কারে কতজন গবেষক কাজ করেছেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমরা ১০-১২ জন কাজ করেছি। গবেষক দলের প্রধান ড. কাকন নাগ (গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের সিইও) ও ড. নাজনীন সুলতানা (গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের সিওও)। তারা দুজন আমাদের এক্সপার্ট (বিশেষজ্ঞ)। তাদের সুপারভিশনে (তত্ত্বাবধানে) আমরা বাকিরা কাজ করেছি। তারা দুজনই কানাডায় আটকা পড়েছেন।

জাগো নিউজ : কানাডা থেকে তারা কীভাবে নেতৃত্ব দিলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : এখন তো গ্লোবালাইজেশনের (বিশ্বায়নের) যুগ। আজকের সংবাদ সম্মেলনেও তাদের যুক্ত রেখেছিলাম। এখন তো আর ফিজিক্যালি (শারীরিক) যাওয়া লাগে না।

জাগো নিউজ : আপনাদের টিকা সফল হলে সেটা মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : এই টিকা সুস্থ মানুষের শরীরে দেয়া হবে। ইনজেকশনের মাধ্যমে মানুষ টিকাটি গ্রহণ করবে।

জাগো নিউজ : একজন ব্যক্তিকে কয়টি ইনজেকশন নিতে হবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমাদের এখনও একটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাকি আছে। আমরা অ্যানিমেল (প্রাণী) মডেলে কাজ করেছি। এখন আমাদের হিউম্যান (মানবদেহে) মডেলে কাজ করতে হবে। হিউম্যান মডেলে কাজ করে ‘ডেজ ওয়ান’ একটা স্টাডিজ আছে এবং ‘ডেজ টু’ একটা স্টাডিজ আছে। ‘ডেজ টু’ স্টাডির মধ্যে কয়েকবার ডোজটা দিতে হবে, দিলে অ্যান্টিবডি গ্রো (গড়ে উঠবে) হবে, যে অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাস মেরে ফেলতে পারবে। অর্থাৎ সেটাকে নিউট্রিলাইট করতে পারবে। হিউম্যান মডেলের কাজ বাকি, এটা এখনও আমরা নির্ধারিত করতে পারিনি। এটা নির্ধারণ হবে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর।

জাগো নিউজ : সফল হলে প্রথম ধাপে কত টিকা আনার সক্ষমতা আপনাদের রয়েছে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : প্রথম ধাপে আমাদের ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন (৫০ থেকে ৭০ লাখ) টিকা তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। তারপর উৎপাদন আরও বাড়াব। যখন আমরা এক্সপোর্ট (রফতানি) করব, তখন আরও বড় পরিসরে তৈরি করতে পারব।

জাগো নিউজ : এই টিকা কি গরিব মানুষ কিনতে পারবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্যাক্সিনেশনে পুরস্কার পেয়েছেন। কারণ, আমাদের দেশে বেশিরভাগ টিকাই বিনামূল্যে দেয়া হয়। টিকাটি যখন আমরা বাণিজ্যিকীকরণ করব, তখন এমনও হতে পারে সরকার জনগণকে ফ্রি করে দিয়েছে কিংবা স্বল্প দামে দিচ্ছে। আমরা যেহেতু উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, আমাদের তো খরচ আছে, আমরা তো আর ফ্রি দিতে পারব না। এখন সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা এই টিকা জনগণকে ফ্রি দেব, সেক্ষেত্রে আমরা হয়তো লাভ না করলাম। আমাদের যে উৎপাদন খরচ, সেটা হয়তো আমরা সরকারের কাছ থেকে নিলাম।

জাগো নিউজ : সরকার আপনাদের কাছ থেকে কিনে জনগণকে ফ্রি না দিলে সাধারণ মানুষের পক্ষে এই টিকা কেনার সক্ষমতা থাকবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : গরিব মানুষের কেনার সক্ষমতা থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে আমাদের চেয়ারম্যান তো বলেছেন, সব জায়গায় আমরা প্রোফিট (লাভ) করব না। আমাদের আরও অন্যান্য ওষুধ আছে, সেগুলো দিয়ে লাভ করলাম। এটা উৎপাদনে আমাদের যে খরচ, সেটা দিয়েই আমরা দিয়ে দিলাম। সবার নাগালের মধ্যে আমরা দাম নির্ধারণ করব। এতে অতিদরিদ্র মানুষও এই টিকা কিনতে পারবে।

জাগো নিউজ : বিশ্বের বিভিন্ন দেশ টিকা আবিষ্কারে কাজ করে যাচ্ছে। অনেকেই এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ট্রায়ালে সফল। তারা যে মান বজায় রাখছে, তেমন মান বজায় রাখা কি আপনাদের পক্ষে সম্ভব?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : মানের ব্যাপারে আমরা খুবই সচেতন। আমাদের টিকার মান অন্য যেকোনো কোম্পানির চেয়ে ভালো হবে। কারণ, আমাদের যে ল্যাব স্ট্যাটাস, আমাদের যে মেশিন, বিশ্বের সেরাটা আমরা কিনেছি। যেহেতু আমাদের মানসম্পন্ন মেশিনারিজ আছে, আমাদের দক্ষ জনবল আছে, কাজেই আমাদের টিকা খারাপ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

[আজকের সংবাদ সম্মেলনে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশীদ বলেছেন, ২০১৫ সালে আমরা এই ল্যাবটা তৈরি করি। ল্যাবটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই ল্যাবে আমাদের প্রায় ৫-৬ শ’ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আমাদের প্রায় ২৬ জন বিজ্ঞানী এখানে কাজ করেন। তার মধ্যে সাতজন পিএইচডি করা]

জাগো নিউজ : করোনার জিনোম সিকোয়েন্স (জিন নকশা) ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। আপনাদের টিকা কি সব জিনোম সিকোয়েন্সের ক্ষেত্রে কাজ করবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমাদের দেশে যে করোনাভাইরাস, তার একটা ট্রিটমেন্ট (চিকিৎসা) আছে। এই ট্রিটমেন্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকজন করেছে। এনসিবিআইয়ে (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) ভাইরাস ডাটাবেজে ৫ হাজার ৭৪৩টি জিনোম সিকোয়েন্স জমা হয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশেরও ৭৬টি জিনোম সিকোয়েন্স আছে। সবগুলো সিকোয়েন্স আমরা স্ক্রিনিং করে টিকার টার্গেট সেট করেছি। সেই অনুযায়ী আমরা টিকা তৈরি করেছি, যাতে সব ধরনের করোনাভাইরাসের জন্যই এটা কার্যকর হয়।

জাগো নিউজ : টিকা বাজারে আসতে কতদিন লাগতে পারে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমরা যদি কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার না হই, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে বাজারে আনতে পারব। মানে ছয় মাস লাগতে পারে।

জাগো নিউজ : আপনাদের সামনে এখন কী কী ধাপ রয়েছে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমরা এখন ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে যাব। তাদের একটা গাইডলাইন আছে। তাদের গাইডলাইন অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে কাজ করব।

গাইডলাইনগুলো সম্পর্কে আমরাও জানি। তারা ডব্লিউএইচও’র একটা গাইডলাইন ফলো করেন। ওই অনুযায়ী আমাদের এখন যে ডেভেলপমেন্ট ডাটা আছে, সেগুলো তাদের কাছে ইস্যু করব। তারা হয়তো বলবেন, আমাদের একটু স্টাডি করতে হবে। রেগুলেটরি ওয়েতে আমরা আরেকটি স্টাডি করব, করলে ওই ডাটাগুলোসহ ওষুধ প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা বিএমআরসিতে (বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার) ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অ্যাপ্লিকেশন (আবেদন) করব। তারা সিআরও বা থার্ড পার্টি। তারা আমাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটা করে দেবে। বিএমআরসি আমাদের প্রটোকল রিভিউ করে ক্লিয়ারেন্স দিলে ওষুধ প্রশাসনের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করব।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর টিকা বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আবেদন করব। তারা আমাদের অনুমোদন দিলে উৎপাদনে চলে যাব। বাজারে চলে আসবে টিকা।

জাগো নিউজ : আপনাদের টিকার আরও উন্নয়নে পরিকল্পনা আছে কি-না?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমাদের ডেভেলপমেন্টের যে অর্জন, সেটাই তো আমরা আজ ঘোষণা দিলাম। বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আমরা রেগুলেটরি উপায়ে বাকি ধাপগুলো এগিয়ে যাব। এর মাঝখানে যদি কোনো ধরনের সমস্যা ধরা পড়ে, তখন আমরা এর ডেভেলপ করব।

পিডি/এমএসএইচ/এমএআর/জেআইএম