দেশজুড়ে

একজন আদর্শবান শিক্ষকের গল্প

শিক্ষার্থীদের সততায় উদ্বুদ্ধ করে তাদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মহৎ কাজটি দীর্ঘ তিন দশক ধরে করে যাচ্ছেন সোপানুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সোপানুল ইসলাম তার শিক্ষক বাবার অনুপ্রেরণায় শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনায় এম কম ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইংরেজিতে এম এ সম্পন্ন করেন সোপানুল ইসলাম।

তার মতে, ইংরেজি জানা মানেই জ্ঞানের বিশাল রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া। ইংরেজি জানলে নিজেকে গ্লোবাল কমিউনিটির সঙ্গে সহজেই সম্পৃক্ত করা যায়। আর তাই ইংরেজিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন তিনি।

ওপেন হার্ট সার্জারি করা ৫০ বছর বয়সী এই শিক্ষক এখনও রাত জেগে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার সমন্বয়ে কীভাবে ইংরেজি গ্রামারকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করা যায়- তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা এবং লেকচার শিট ও টিচিং এইডস তৈরি করেন। শিক্ষার্থীরাও নিজেদের আদর্শ মনে করেন তাদের প্রিয় শিক্ষক সোপানুল ইসলামকে।

সোপানুল ইসলামের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এখন সম্মানজনক অবস্থানে আছেন। এদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কবি ও সঙ্গীত শিল্পীও রয়েছেন। তাদের অনেককেই বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন শিক্ষক সোপানুল ইসলাম।

বাবা মনিরুল ইসলামের আগ্রহেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে সহজভাবে উপস্থাপন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সোপানুল ইসলাম। ২০০৫ সালে আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর থেকেই প্রতিদিন ১৫ মিনিট ইংলিশ স্পিকিং আওয়ার চালু করেন সোপানুল ইসলাম। এর ফলে শিক্ষার্থীরাও ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে।

সম্প্রতি শিক্ষক হয়ে ওঠা ও শিক্ষকতার প্রতিবন্ধকতাসহ নানা বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনপ্রিয় এই ইংরেজি শিক্ষক। তিনি জানান, করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যেও বিভিন্ন টিচিং অ্যাপস ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

সোপনুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষককে আগে অনুকরণীয় আদর্শের অধিকারী হতে হবে; তারপর তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিকতার আদর্শিক রূপ চিত্রায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে একজন শিক্ষকই উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করতে পারেন।

তিনি বলেন, আমার দার্শনিক বাবার আগ্রহেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাই শত শত নির্ঘুম রাতের প্রতি প্রহরে জেগে থেকে থেকে নানা কৌশলে ইংরেজি শিক্ষার বিষয়গুলোকে সহজভাবে শৈল্পিক রূপ দিয়ে সাজিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

সোপনুল ইসলাম বলেন, আমার টিচিং মেথডটি হলো- একটি বাক্যের গঠনপ্রণালী জেনে শত শত বাক্য বানানোর কৌশল আয়ত্ত করা। অল্প কিছু ভার্বের (ক্রিয়া) ব্যবহার জেনে অসংখ্য প্যারাগ্রাফ ও অন্যান্য বাক্য গঠন প্রক্রিয়া আত্মস্থ করা। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে শতভাগ অংশগ্রহণভিত্তিক শিখন ফল বের করে আনা। শুধু লিসেনিং এবং কয়েকটি বাক্যের গঠন প্রণালী জেনে ইংরেজিতে স্পিকিং বিষয়টি সহজ করা।

তিনি বলেন, আমার দুই ছেলে এখনও স্কুল শিক্ষার্থী। আমার ইচ্ছা তাদের একজনকে অন্তত আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষক বানাবো। যেন সে নিষ্ঠাবান শিক্ষকতার আবরণে ডিজিটাল রোবটিক যুগে মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারে।

তবে শিক্ষকদের আর্থিক দৈন্যদশা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপও রয়েছে সোপানুল ইসলামের। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার কাছে সম্মানের মূল জায়গাটি স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু সম্মানের জন্য এখন আর মানুষ শিক্ষক হতে চায় না। যোগ্যতাসম্পন্ন মেধাবী মানুষগুলো এখন শিক্ষকতার চেয়ে টাকার নেশায় তাড়িত হচ্ছে বেশি।

শিক্ষাঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গনেও সমান পরিচিত শিক্ষক সোপানুল ইসলাম। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ জাগানোর সকল শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পান তিনি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শোনেন।

শিক্ষক সোপানুল ইসলামের ছাত্রী নিশাত তাসনিম বলেন, স্যার সব সময় আমাদের অনুপ্রাণিত করেন এবং কীভাবে সামনের দিক অগ্রসর হতে হবে সেই দিক-নির্দেশনা দেন। আমাদের সব সময় বলেন - আগে ভালো মানুষ হও, তাহলে জীবনে সফল হতে পারবে। স্যারের এই কথাটি সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।

সোপানুল ইসলামের ছাত্র বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, স্যার ব্যক্তিজীবনে শতভাগ সৎ মানুষ এবং আমার দেখা একমাত্র শিক্ষক যিনি ছাত্রছাত্রীদের জন্য তার কর্মরত প্রতিষ্ঠানে মধ্যরাত পর্যন্ত পর্যন্ত কাজ করেন। স্যারের অনেক ছাত্রছাত্রী এখন ভালো অবস্থানে আছেন, কিন্তু এসব নিয়ে স্যারের মাঝে কখনোই অহংকারী মনোভাব দেখিনি।

সোপানুল ইসলামের সহকর্মী ও আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক অভিজিৎ রায় বলেন, সহকর্মী হিসেবে স্যারের মতো একজন মানুষ পেয়ে আমরা সত্যি ভাগ্যবান। রাত-বিরাত যখনই কোনো শিক্ষার্থী স্যারকে কোনো কিছু জানা বা বুঝার জন্য ফোন করেন অথবা অনলাইনে নক করেন, স্যার তখনই সাড়া দিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে সেটি বুঝিয়ে দেন। স্যারের এই বিষয়টি আমাদের সকল শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণা।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমকেএইচ