আইয়্যামে জাহেলিয়া অর্থ অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) জন্মের পূর্ববর্তী সময়কে আইয়্যামে জাহেলিয়া বলা হয়। ওই সময়ের সামাজিক অনাচারের বিষয়গুলো তুলে ধরে আমরা ইসলাম পূর্ব আরবের মানুষদের বর্বর বলি। বিশেষ করে নারী নির্যাতন, নারীকে পণ্য বিবেচনা করে ভোগ করা ও মেয়ে শিশুকে জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যার ঘটনার কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরি। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক অনাচারের ফিরিস্তি তুলে ধরলে আইয়্যামে জাহেলিয়ার ওই সামাজিক অনাচার যে নস্যি, তা যে কেউ সহজে উপলব্ধি করতে পারবেন। মায়ের পেটে শিশুকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা, নিজের আপন মাকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উত্যক্ত করায় মা কর্তৃক পুত্রকে হত্যা, পরকীয়া প্রেমে আসক্ত মা কর্তৃক শিশুদের হত্যা, বাবা কর্তৃক মেয়েকে ধর্ষণ, ভাই কর্তৃক বোনকে ধর্ষণ, শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে ধর্ষণ, মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন, ক্যান্টনমেন্টের মতো সুরক্ষিত এলাকায় ধর্ষণের পর কলেজ শিক্ষার্থীকে হত্যা, অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম নেয়া শিশুকে ছয়তলার ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যার চেষ্টা বা ডাস্টবিনে অথবা জঙ্গলে ফেলে দেয়া, চলন্ত বাসে গার্মেন্টস কর্মীকে ধর্ষণ, কাজের মেয়ের সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও হত্যা, ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে যদি তালিকা করতে থাকি; তবে ওই তালিকা যে খুব সহজে শেষ হবে না, তা বলা যায়।ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ছাত্র হিসেবে নিশ্চিত করে বলছি- আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগে এমন একটি বর্বর ঘটনাও ঘটেনি। বরং সেই সময়ের মানুষরা বর্তমান বাংলাদেশের মানুষদের থেকে সভ্য ছিল! তখন অবাধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হতো সত্য। কিন্তু যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর জন্ম নেয়া শিশুকে পিতারা অস্বীকার করতেন না। ওই সব শিশুরা পিতৃ পরিচয় নিয়েই সমাজে বসবাস করত। এমনকি অসংখ্য পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর কোনো নারীর সন্তান জন্ম হলে ওই এলাকার সকল পুরুষকে নিয়ে একটি সভা বসত। ওই সভায় একজন আকৃতি বিশারদও থাকতেন। তিনি শিশুর চেহারার সাথে ওই অঞ্চলের সব পুরুষের চেহারা মিলিয়ে দেখতেন। ওই চেহারা যার সাথে মিলে যেত তাকে শিশুর পিতা হিসেবে ঘোষণা করতেন। যাকে শিশুর পিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে তা মেনে নিতেন।কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম নেয়া শিশুর মাকে সন্তানের পিতৃ পরিচয় আদায় করতে প্রেমিকের বাড়ির সামনে অনশন করতে হয়। আত্মহত্যার ঘটনাও বিরল নয়। আইয়্যামে জাহেলিয়ার ইতিহাসে কখনও ধর্ষণের পর কোনো নারীকে হত্যা করা হয়নি। কোনো নারী ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেনি। শিশু ধর্ষণের তো প্রশ্নই আসে না। সৎ মাকে পুত্র কর্তৃক বিবাহ করার ঘটনা ঘটলেও আপন মাকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে উত্যক্ত করা হয়েছে এমন ঘটনা অসম্ভব। আইয়্যামে জাহেলিয়া যুগের কোনো মানুষ যদি আজ বেঁচে থাকত; তাহলে বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ ওই সময়ের মানুষকে বর্বর, ওই যুগকে আইয়্যামে জাহেলিয়া বা অন্ধকারাচ্ছন যুগ বললে নিশ্চিত করে বলা যায়, তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করতেন। আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক অনাচারের তুলনামূলক অধ্যায়ন করলে- এই সময়ের চেয়ে ওই সময়ের মানুষরা বেশি সভ্য ছিল, তা খুব সহজে উপলব্ধি করা যাবে। আমাদের ভাগ্য ভাল, ওই সময়ের কেউ আজ আর জীবিত নেই! এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও কেন আমরা বর্বরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? এদেশের সামাজিক অনাচারের ফিরিস্তি দেখে যে কেউ এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন- ইসলাম ধর্ম কি আজ তার কার্যকারিতা হারিয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ইসলাম ধর্মের কার্যকারিতা এক বিন্দুও কমেনি। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সময়ে যে ইসলাম ধর্ম আইয়্যামে জাহেলিয়ার অন্ধকারকে দূর করে মানব সভ্যতাকে আলোর পথ দেখিয়েছিল; আজও যদি মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চলেন তাহলে এখনও ওই ইসলাম ধর্ম পাথরে ফুল ফোটাবে। কিন্তু ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এদেশের মুসলিমরা আজও তা উপলব্ধি করতে পারেননি। উপরন্তু তারা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সামাজিক সংস্কারকে রাজনীতিকরণ করে শান্তিবাদী ধর্ম ইসলামকে রাজনৈতিক ধর্মে পরিণত করতে সদা তৎপর। ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটি খুঁটি রাজনীতি না হলেও অথবা নামায, রোযা, হজ, যাকাতের মতো আল-কুরআন ও আল-হাদীসের কোথাও মুসলিমদের রাজনীতি করা ফরজ এমনটি বলা না হলেও ক্ষমতার স্বাদ পেতে ইচ্ছুক কথিত ইসলামী চিন্তাবিধরা রাজনীতিকে সব কিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। তারা সমাজ সংস্কারের বদলে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে কিভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া যায় সেই ফন্দি আটেন দিনরাত্রি। আল-কুরআন ও আল-হাদীসে নির্দেশ না থাকলেও বা মহানবী (সা.) ও তাঁর প্রাণপ্রিয় সাহাবীদের প্রতিষ্ঠিত খিলাফতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা না হলেও তারা রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠায় হরতাল আহ্বান করেন। যিনি একদিনও মহান আল্লাহর প্রার্থনার জন্য মসজিদের পথে পা বাড়াননি তিনিও তার মুসলমানিত্ব প্রমাণ করতে হুংকার ছেড়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন- রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে ইসলাম বহাল না থাকলে দেশে রক্ত গঙ্গা বয়ে যাবে! ১৯৭১ সালে নিরীহ বাঙালি মা-বোনদের ধর্ষণ ও হত্যাকারীরা হয়ে যান বড় বড় ইসলামি চিন্তাবিধ। দেশ বরেণ্য তাফসীরে কোরআন বিশারদ। সেই দেশে শতভাগ মানুষ মুসলিম হলেও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটবে, মায়ের পেটে শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হবে অথবা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে নারীর ব্লেডের আঘাতে পুরুষের অণ্ডকোষ কাটা পড়বে- না তো কি হবে!এদেশের আলেম সমাজ যতদিন সাধারণ মানুষের নিকট ইসলাম আরবে রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল- তা তুলে না ধরবেন, এদেশের মুসলিমরা মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) ওই সামাজিক সংস্কারকে মনেপ্রাণে ধারণ না করতে পারবেন; ততদিন আইয়্যামে জাহেলিয়ার বর্বরতা এদেশের সমাজ থেকে দূর হবে না। বরং একের পর এক সামাজিক অনাচারের ঘটনাগুলো ঘটতে থাকবে। নির্যাতনের পর শিশু হত্যার মতো ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা মহামারী আকার ধারণ করবে। আর পরিস্থিতি এমন দাঁড়াবে যে এদেশের পুরুষদের দেখলে ধর্ষিত হওয়ার ভয়ে বনের পশুরাও ছুটে পালাবে।লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়এইচআর/এবিএস