ফিরে যাবো বৈশাখে
এদেশে গ্রীষ্মকাল এলো এলো বলে।
কথা নেই, বার্তা নেই আজ বিকেলে আকাশ জুড়ে কাল মেঘ এসে হাজির। দমকা বাতাস এসে যোগ হোল তারসাথে। আমার অফিসের রুগী দেখা শেষ করে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি। আকাশে কালো মেঘ আর তার সাথে ঠাণ্ডা দমকা হাওয়া মুহূর্তের মাঝে নিয়ে গেলো আমার ছোটবেলায়। মনে হোল বৈশাখের শুরুতে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরবার পথে আছি। এখনি কাল বোশেখি ঝড় শুরু হবে। এখনি বাড়ি ফিরতে হবে...
অরলান্ডোতে কাল বোশেখি ঝড় সচরাচর হয় না। আর কাজের মাঝে আমারও বাড়ি ফিরতে চাইতেও সহজে যাওয়া হয় না। অনেকগুলো রোগী হাসপাতালে অপেক্ষাতে রয়েছে আজ। প্রথম রোগীটির নাম দেখে চমকে উঠলাম। আমার এক বন্ধুর নামে নাম।
ওর তো এখানে থাকার কথা নয়। তবে আমার বন্ধুর সাথে এই ভদ্রলোকের বয়সে বিস্তর তফাৎ। সত্তর বছরের দীর্ণ শীর্ণ এক ভদ্রলোক বিছানাতে শুয়ে আছেন। আধবোজা চোখ। বিছানার পাশের টেবিলে দুপুরের না খাওয়া খাবার। অবশ্য এসব অখাদ্য একজন বাঙালির পক্ষে খাওয়া বড়ই কঠিন।
আমি বাংলাতে কথা বলতেই তিনি চমকে উঠলেন। মনে হোল প্রাণ ফিরে পেলেন। উনি দেশ ছেড়েছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। বছর তিনেক ছিলেন গ্রীসে। এরপর সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজে চেপে বসলেন। একযুগ কাটিয়ে দিলেন সমুদ্রের মায়ায়। কখনোই ভাবেননি ফিরে যাবেন দেশে। ভূমধ্যসাগরের গভীর নীল পানির সাথে সখ্য হয়ে গেলো তার। সখ্য হোল গাংচিলের সাথে, নীল আকাশের সাথে। স্যান্তোরিনি নামে অপূর্ব সুন্দর এক দ্বীপে এসে মতিভ্রম হয়ে গেলো তাঁর। অলিম্পিয়া নামে এক উচ্ছল গ্রীক তরুনি তাঁর মন কেড়ে নিল। সব ছেড়ে তাঁর সাথে থাকতে চাইলেন তিনি সেই দ্বীপে। ভূমধ্যসাগরের গভীর নীল জলের ভেতর থেকে গজিয়ে ওঠা এ পাহাড়ী দ্বীপের গা বেয়ে সাদা আর নীল রঙের সব বাড়িঘর যেন স্বর্গের আরেক রুপ।
দু`বছর কেটে গেলো সে স্বর্গে। এই স্বর্গেও দুঃখ- বেদনা থাতে পারে ভাবতে পারেননি তিনি। এক তীব্র জোছনার রাতে অলিম্পিয়া তাঁকে ছেড়ে গেলেন। দুজনে মিলে একসাথে ছুঁয়ে দেখছিলেন জোছনার আলো। মস্তিষ্কে নাকি একটি শিরা ছিঁড়ে গিয়েছিল অলিম্পিয়ার।
এরপর থেকে জোছনা ভরা রাত ভয় পান তিনি।
দেশে ফিরে যেতে যেতে যাওয়া হোল না। মা বাবা বেচে নেই। ভাই বোনরা কে কোথায় খবর নেই তার।
সারা দুনিয়া ঘুরে এসে পৌঁছালেন কিউবাতে দশ বছর আগে। এরি মধ্যে জীবনের ছন্দ বদলে গেছে তাঁর। মদ্যাসক্তিতে তাঁর লিভারে দূরারোগ্য রোগ হয়েছে। ছোট এক ডিঙ্গিতে করে পৌঁছালেন মায়ামিতে আরও কিছু মানুষের সাথে। রাজনৈতিক আশ্রয় পেলেন তিনি।
হাইতির এক পরিবারের কৃপাতে কিছুদিন ছিলেন মায়ামিতে। কিন্তু স্বপ্নের ঘোরে কেবল বাংলাদেশের কথা, তাঁর শৈশবের কথা ভেসে ওঠা শুরু হলে তার। ঘুমের ঘোরে কেবল কাল বোশেখের কথা বলেন তিনি। আম কুড়োনোর কথা বলেন। মুষলধারে বৃষ্টির কথা বলেন। কার কাছ থেকে শুনেছেন অরলান্ডোতে প্রচুর বাংলাদেশি থাকেন। গ্রে হাউন্ডের বাসে করে যখন অরলান্ডো পৌঁছালেন, তখন তিনি একেবারেই গভীর ঘোরের মাঝে।
প্রাথমিক চিকিৎসার পর এখন খানিকটা ঘোর ফিরে পেয়েছেন তিনি।
আমার হাতটা ধরে বললেন, " এই বোশেখে দেশে ফিরতে চাই।" কচি সবুজ ধানের খেতে বাতাসের উদোম নাচন দেখার তার খুব ইচ্ছে। ইচ্ছে তার মুচিপাড়ায় যেয়ে মেঘলা রাতে বাউলের একতারার সাথে এক হয়ে যাওয়া। ইচ্ছে তাঁর দমকা হওয়ার মাঝে জীবনটাকে আবার খুঁজে পাওয়া।
কাজ শেষ হয়ে গেলো আজ। হাসপাতাল ছেড়ে ঘরে ফেরার পথে কাল বোশেখের মতো ঝড়। দূরে কোথাও বাজ পড়েছে। আকাশ জুড়ে নামছে অন্ধকার। আমারও খুব দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। এ বৈশাখে রমনার বটমূলে গান শুনতে চাই। রাস্তার পাশে বসে পান্তা খেতে চাই। শত মানুষের ভিড়ে পুরনো বন্ধুকে হঠাৎ ফিরে পেতে চাই।
অন্ধকার নামছে হাইওয়েতে। রবিঠাকুরের গান বাজছে। গানটাকে কেমন যেন অচেনা মনে হোল...
" যে পথ দিয়ে যেতে ছিলাম
ভুলিয়ে দিল তারে,
আবার কোথা চলতে হবে
গভীর অন্ধকারে।
বুঝি বা এই বজ্ররবে
নতুন পথের বার্তা কবে,
কোন পুরিতে গিয়ে তবে
প্রভাত হবে রাতি।"
লেখক : ডা. বিএম আতিকুজ্জামান, পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিভাগীয় প্রধান, ফ্লোরিডা হাসপাতাল, ফ্যাকাল্টি, কলেজ অব মেডিসিন, সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি
এইচআর/এমএস