দলীয় কোন্দলে বিলীনের পথে জিয়ানগর বিএনপি
চরম দলীয় কোন্দলে বিপর্যস্ত জিয়ানগর বিএনপি এখন অস্তিত্ব হারিয়ে বিলীন হবার পথে। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যেখানে চেয়ারম্যান এবং পুরুষ ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদে বিএনপি প্রার্থীরা অনেক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন, এর মাত্র ২ বছর পরে সদ্য সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে বিএনপির এই দূর্গে সব ইউপিতে জামানত হারালো বিএনপির প্রার্থীরা।
জিয়ানগরে মোট ভোটের ৭৫ শতাংশ ভোট বিএনপি জামায়াতের। তবুও এখানে ইউপি নির্বাচনে সব ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীদের জামানত হারানোর ঘটনা সহজে মেনে নিতে পারছেন না বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। এ পরাজয় তাদের কাছে নিজ পায়ে কুড়াল মারার মত।
প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে বিএনপি প্রার্থীরা পেয়েছে বৈধ ভোটের পত্তাশী ইউনিয়নে ৭.২৪ শতাংশ, পাড়েরহাট ইউনিয়নে প্রায় ৩ শতাংশ এবং বালিপাড়া ইউনিয়নে দশমিক ৬১ শতাংশ। পরাজয়ের এ কারণ খুঁজতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বেরিয়ে আসছে একের পর এক তথ্য। শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দলীয় প্রার্থীদের বিপরীতে কাজ করার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে পাড়েরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক নাসির উদ্দিন, পাত্তাশীর সম্পাদক আজাদ হোসেন বাচ্চু এবং উপজেলা বিএনপির সম্পাদক ফায়জুল কবির তালুকদারকে।
এখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এমন আকার ধারণ করেছে যে, কোনো এক গ্রুপের কেউ প্রার্থী হলে অন্য গ্রুপের লোকজন ঘোষণা দেয় যে, প্রার্থী হারলে তারা খুশিতে মিলাদ দেবে। আবার কোনো ওয়ার্ডে বিএনপির এক গ্রুপের কেউ ইউপি সদস্য পদে দাঁড়ালে তাকে হারাতে একই ওয়ার্ডে অন্য গ্রুপের আরেকজন দাঁড়িয়েছে।
পাড়েরহাট ইউনিয়নের টগড়া ওয়ার্ডে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন বিএনপির অন্য গ্রুপের ২ জন, জামায়াতের ১ জন এবং আওয়ামী লীগের ১ জন। যদিও ঐ নেতা একাই ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এসব কারণে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা রাগে ও ক্ষোভে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন অনেকেই।
কোন্দলের কারণ হিসেবে দেখা গেছে, জিয়ানগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফ হাওলাদার এবং সাধারণ সম্পাদক ফায়জুল কবির তালুকদার পরপর ২ মেয়াদে এ পদে আছেন। এ দুই নেতার মাঝে সাপে নেউলে সম্পর্ক। দল ও অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনে প্রভাব বিস্তার এবং কাজের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে তাদের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। নেতাকর্মীরাও ২ ভাগে ভাগ হয়ে পড়ায় দলীয় কর্মসূচিও চলে আলাদা ভাবে।
বালিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে ৫ বছর ধরে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সভাপতি আব্দুল লতিফ হাওলাদার দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। সম্পাদক ফায়জুল কবির তালুকদার মূল দল এবং অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনের সময় ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করা, ঢাকায় অবস্থানরত এবং বিদেশ থেকে আসা টাকাওয়ালা লোকদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদে বসানো এবং তার বেষ্টনীর চারপাশের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দেবার কারণে দলে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
আর সেই বিভাজনের কারণেই এখানে বিএনপি দিনদিন অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়ছে। দলের নীতিনির্ধারকদের কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে দলের মেরুদণ্ডও ভেঙে পড়ছে। আর এ কারণে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা রাজনীতির মাঠ ছেড়ে ঘরমুখো হয়ে পড়ছেন।
জামায়াত-বিএনপির দূর্গ জিয়ানগরে বিএনপি প্রার্থীদের পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফ হাওলাদার বলেন, দলীয় কোন্দল আর জামায়াতের ভোট না পাওয়ার কারণে আমরা হেরেছি। এছাড়া উপজেলা বিএনপির সম্পাদক ফায়জুল তালুকদার তার অনুসারীদের নিয়ে তার ভাইয়ের পক্ষে কাজ করেছেন।
উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল কালাম শিকদার বলেন, দলীয় কোন্দল, জামায়াতের সঙ্গে জেপি’র আতাত এবং উপজেলা সেক্রেটারির ভাই অন্য দলের প্রার্থী থাকায় বিএনপির পরাজয় হয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক (সাময়িক বরখাস্ত) ফায়জুল কবির তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাপ করে তার মন্তব্য পরে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
উপজেলা যুবদলের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, আমাদের ৩ গুণ বেশি ভোট থাকা সত্যেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এখানে বিএনপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন।
জিয়ানগরে বিএনপি প্রার্থীদের পরাজয় এবং জোটের শরীক জামায়াত নেতাদের নীরব থাকার কারণ জানতে চাইলে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল হাই বলেন, আমাদের এখন দলও নাই, মার্কাও নাই। আবার যখন জোট গঠন হবে তখন দেখা যাবে।
জোট ভেঙে গেল কবে? এ প্রশ্নের তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এফএ/আরআইপি