চট্টগ্রামের ডিসি পার্কে ফুলের পসরা দেখতে দর্শনার্থীদের ঢল
দৃষ্টি যতদূর যায় শুধু ফুল আর ফুল। এ যেন সাগরপাড়ে ফুলের রাজ্য। মনমাতানো এ দৃশ্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটের ডিসি পার্কের। সাগরপাড়ে ঘন কেওড়া বনের পাশে বসেছে ১৪০ প্রজাতির লাখো ফুলের মেলা। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) থেকে মাসব্যাপী এই মেলা শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই ফুল উৎসবে দেখতে দূরদূরান্ত ছুটে আসছেন হাজারো দর্শনার্থী।
উৎসবে শুধু ফুল নয়, রয়েছে শিশুদের নানা ধরনের রাইডিং। শিশুদের জন্য কিডস জোন, দৃষ্টিনন্দন রেস্তোরাঁ, পানিতে বাঁশের তৈরি ভাসমান সেতু। এবার এখানে জায়ান্ট ফ্লাওয়ার, ট্রি হাউজ, ট্রিপল হার্ট শেলফ, ট্রেন, বক, ময়ুরসহ বিভিন্ন নান্দনিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি লাখো ফুলের সমাগম ঘটেছে এবার। শতশত মানুষ সেখানে ফুলকে সঙ্গী ছবি তুলতে ব্যস্ত।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ডিসি পার্কে এবার বেশ পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুক্রবার থেকেই পার্কের দুটি প্রবেশ গেটে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ৫০ টাকার টিকিট কেটে ভ্রমণ পিপাসুরা পার্কে প্রবেশ করছেন। বাইরে রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা, ভেতরে যেতেই জোড়া দিঘির উত্তরে ছনের ছাউনির সারি সারি দোকান চোখে পড়ে। এসব দোকানে পিঠাপুলিসহ নানারকম দেশীয় খাবারের সমাহারে গ্রামীণ মেলা বসিয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।

বাগানে বিদেশি ফুলের মধ্যে আছে লিলিয়াম, ম্যাগনোলিয়া ও ক্যামেলিয়া। আর দেশি ফুল আছে, গাধা, জবা, কৃষ্ণচূড়া, চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদি। দিঘির উপরে আছে জিপ লাইনিং। দলবেঁধে যুবকেরা সেটি উপভোগ করছেন। দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে সারি সারি খেজুর গাছ সবার নজর কাড়ছে। সেখানে রস পড়ার দৃশ্য, পাখিদের কলবর, মৌমাছির গুঞ্জন শুনতে পার্কে আগতদের ভিড় লেগেছে। গাছগুলোও সেজেছে রংধনুর সাত রঙে, চলার পথে বিছানো হয়েছে রঙিন টায়ার।
এছাড়াও দিঘিতে শতাধিক কায়াকিং ও প্যাডেল চালিত নৌকা রয়েছে। এসব নৌকায় ভ্রমণ করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ দৃষ্টিনন্দন বেঞ্চিতে বসে সময়গুলো নিরিবিলি পার করছেন প্রিয়জনের সাথে।

এর আগে ২০২৩ সালে মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত ফৌজদারহাটের ১৯৪ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। সেবারই প্রথম দুবাইয়ের মিরাকল গার্ডেনের আদলে ডিসি পার্ক গড়ে তোলা হয়। এ নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো এই ফুলের মেলার আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার দুপুরে ‘চট্টগ্রাম ফুল উৎসব’ নামে এই ফুল মেলার উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক। এসময় বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ উপস্থিত ছিলেন।

মাসব্যাপী ফুল উৎসবে আঞ্চলিক গানের আসরের ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন। যা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে উপভোগ করতে পারবেন দর্শনার্থীরা। সেইসঙ্গে এই পার্কে আলাদা স্টলে আসন্ন গণভোটের প্রচার চালাবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পার্কে ঘুরতে আসা ইকবাল কবির বলেন, এই আয়োজনে নতুন প্রজন্ম দেশীয় ফুলগুলোর পাশাপাশি বিদেশি ফুলের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবেন। এখানে এসে জনপ্রিয় জিপ লাইনিং উপভোগ করতে পেরেছি আমি, যা তেমন কোথাও পাওয়া যায় না। তাছাড়া স্বল্প খরচে পরিবার নিয়ে এখানে আনন্দমুখর সময় পার করলাম।

শিশু আবির হাসান আলভির ভাষ্য, আমি সব ধরনের রাইড উপভোগ করেছি। এর আগে এত রাইড একসঙ্গে পাইনি।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, এবারের ফুল উৎসবে ১৫টি দেশ থেকে শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রামের শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীরা এখানে আসবেন রুটিন করে। চাটগাঁর আঞ্চলিক কৃষ্টি, সংস্কৃতি তারা তুলে ধরবে। এতে বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশের সংস্কৃতির একটি মেলবন্ধন তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যস্ততম বন্দর নগরীর মানুষ যেন শীতের দিনে অবসর সময়গুলো সবুজের সাথে, মনোমুগ্ধকর পরিবেশে কাটাতে পারে সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভোগান্তি যেন না হয় সেজন্য গত তিন মাস ধরে নানা আয়োজনে এই পার্ককে সাজানো হয়। অতীতের রেকর্ড অনুসারে প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার দর্শনার্থী এই ডিসি পার্কের উৎসবে যোগ দেয়। আমরা আশা করছি এবার ২০ লাখ লোক পার্ক ভ্রমণ করবে। এজন্য আমরা কয়েকটি বুথে গণভোটের প্রচারণা চালাব। পার্কে আগতরা আনন্দ করার পাশাপাশি জাতীয় ইস্যুতে সচেতন হয়ে ওঠবেন।
এম মাঈন উদ্দিন/এমএন/জেআইএম