ছুটি নিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ায় প্রাথমিকের ৪৯ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
মৌলভীবাজারের একবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৯ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অনুমতি না নিয়ে বিদেশ চলে যাওয়া তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এছাড়া এমন অভিযোগে আরও কয়েকজন বিরুদ্ধে মামলা চলমান।
জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে বিভিন্নভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় শিক্ষকদের মাঝে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বিভিন্ন কারন দেখিয়ে প্রথমে ছুটি নেন। পরবর্তীতে তারা বিদেশে চলে যান। সরকারিভাবে চাকরিচ্যুত করা ছাড়া আর কোন উপায় না থাকায় তাদেরকে বাধ্য হয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। যতদিন যাচ্ছে এর সংখ্যা ততই বেড়ে চলছে।
রাজনগর উপজেলার চাটুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কাবেরী রানী দেব। তিনি গত ১৬ অক্টোবর ২০২৪ থেকে ১৪ নভেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত চিকিৎসার কথা বলে ছুটি নেন। নির্ধারিত ছুটি শেষ হওয়ার পর তিনি আর চাকরিতে যোগদান করেননি। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানতে পারেন তিনি চাকরিতে যোগদান না করে বিদেশে চলে গেছেন। বিষয়টি পরে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়। ঠিক একইভাবে চাকরিচ্যুত শিক্ষকেরা বিভিন্ন কারন দেখিয়ে ছুটি নিয়ে আর আসেননি বিদ্যালয়ে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪টি বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করেছি। এরমধ্যে ৪৯ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং ৪ জনকে বিভিন্ন ধরনের সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে পলায়ন ও অসদাচরণ এর অভিযোগ রয়েছে।
কমলগঞ্জের কাউয়ারগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমরজিৎ স্বর্ণকার, সতিঝিরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নোভা নাওয়ার, পতনঊষার বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেখ সায়মা আজিজ, মাইজগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইসরাত জেরিন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আগনসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্যামলী খানম, মৌলভীবাজার সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তাহমিদা ইসলাম, রাজনগর উপজেলার চাটুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাবেরী রানী দেবসহ ৪৯ টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট নিয়ে চলছে পাঠদান। কিছু বিদ্যালয়ে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক এনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক সংকটের কারনে অনেক বিদ্যালয়ে ক্লাসে শিক্ষার্থী থাকলেও পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।
যেসব বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা বিদেশে চলে গেছেন এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রধান শিক্ষকেরা জানান, যারা চলে গেছেন তারা কেউ বিদেশে যাওয়ার জন্য ছুটি নেননি। বেশিরভাগ শিক্ষক অসুস্থতা ও পারিবারিক সমস্যার কথা বলেছেন। ছুটি শেষ হওয়ার পর যখন স্কুলে আসেননি তখন আমরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। পরে শুনেছি সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিদেশে চলে যাওয়ার কয়েকটি কারণ হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম কারন হলে তারা চাকরিতে যোগদান করার সময় যে বেতন-ভাতা পান তা হয়তো তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। এখন যারা নতুন শিক্ষকতায় যোগদান করেন তাদের বেশিরভাগের স্বপ্ন থাকে উচ্চ বিলাসিতার। এজন্য দেশ ত্যাগ করে বিদেশে চলে যাচ্ছেন।
মাইজগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস খান বলেন, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইসরাত জেরিন প্রায় ১১ বছর চাকরি করেন। ২০২৪ সালে জানুয়ারিতে অসুস্থতা দেখিয়ে এক মাসের ছুটি নেন। পরে জানা যায় তিনি বিদেশে চলে গেছেন। তার পরিবর্তে অন্য বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষককে দেওয়া হয়েছিলো তবে তিনি এখনও যোগদান করেননি।
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সফিউল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আমি যোগদান করার পর গত এক বছরে ৪৯ জনকে পলায়নের অভিযোগে বরখাস্ত করেছি। এছাড়া ১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর ও ৪ জনকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আরও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা চলমান। বেশিরভাগ শিক্ষক ছুটি নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। যাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তারা আর চাকরিতে ফিরতে পারবেন না।
এম ইসলাম/এনএইচআর/এএসএম