কুষ্টিয়া-৩

আলোচনায় আমির হামজা, মাঠে এগিয়ে জাকির সরকার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০২:৫৬ পিএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুফতি আমির হামজা ও বিএনপির প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার

কুষ্টিয়ার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন। বিগত পরপর তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। হানিফসহ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির সব নেতাই গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে লাপাত্তা। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশগ্রহণ করতে পারছে না।

কুষ্টিয়া-৩ আসনের প্রার্থী

এক সময় বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল কুষ্টিয়া সদর আসন। ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনসহ অন্য তিনটি আসনও ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুর্গে আঘাত হেনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার রশীদুজ্জামান দুদু। তার মৃত্যুর পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে এখানকার সংসদ সদস্য ছিলেন মাহবুব উল আলম হানিফ। এবারের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন থেকে ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার। অন্যদিকে এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং বক্তা মুফতি আমির হামজা। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. আবদুল্লাহ্ আখন্দ, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) হাতি প্রতীকে মোছা. রুম্পা খাতুন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মই প্রতীকে মীর নাজমুল ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোহা. শরিফুল ইসলাম।

ভোটের ডামাডোল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশের মধ্যে যে আসনগুলি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার মধ্যে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন অন্যতম। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে এ আসনে আমির হামজার নাম ঘোষণার পর থেকেই কুষ্টিয়াসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যে কম-বেশি কৌতুহল এবং আগ্রহ রয়েছে।

বিশেষ করে ওয়াজ মাহফিলসহ ইসলামিক বিভিন্ন আলোচনায় বক্তব্যের কারণে এমনকি ভোটের ময়দানেও বিতর্কিত নানা মন্তব্যের কারণে সামাজিক মাধ্যমে বার বার ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়ে চলেছেন আমির হামজা।

সরেজমিনে এলাকা ঘুরে এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আমির হামজার সঙ্গে দ্বিমুখী লড়াই হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যেই বিএনপি এবং জামায়াতসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে বেশ জোরে সরেই প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। দুই দলের প্রার্থী এবং তাদের কর্মী সমর্থকরা সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-দখলবাজি বন্ধসহ কুষ্টিয়া জেলার সার্বিক উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। এই দুই দল ছাড়াও ভোটের মাঠে অন্যান্য দলের প্রার্থী-সমর্থকরাও কম-বেশি প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, আলোচনায় জামায়াতের প্রার্থী মুফতি আমির হামজা এগিয়ে থাকলেও ভোটের হিসাবে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার।

শহরতলীর জগতি এলাকার মুদি দোকানি আরিফুল ইসলাম বলেন, জামায়াত আগে কখনো দেশ পরিচালনা করেনি। অন্যদিকে বিএনপির দেশ পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। যদিও তাদের নামে চাঁদাবাজি-দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে। তারপরও শেষবারের মতো তাদের আরেকবার ভোট দিয়ে দেখতে চাই।

সাংস্কৃতিক কর্মী আব্বাস বলেন, ২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বিভিন্ন ইস্যুতে আমরা জামায়াতের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করেছি। আমাদের শিল্পী সমাজের কাছে মনে হয়েছে এদেশের শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এ দলটি নিরাপদ নয়। তাই যাদের হাতে আমাদের শিল্পী সমাজ নিরাপদ থাকবে, আমরা অনুকূল পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবো, সেই দলকেই ভোট দেবো।

কুষ্টিয়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী হুমায়ারা নওশিন বলেন, জুলাই-আগস্ট পরবর্তী সময় আমরা দেখেছি একটি দলের নেতা-কর্মীরা কীভাবে সারাদেশে চাঁদাবাজি-দখলবাজি করেছে। আমরা কোনোভাবেই সেই দলকে এবার ভোট দেবো না। যারা জুলাইয়ের চেতনা বুকে ধারণ করে, সেই দলকেই আমরা বেছে নেবো।

এদিকে সংসদ নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে এখানে নির্বাচনের উত্তাপ যেন ততই বাড়ছে। বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, দলীয় কোন্দল নিরসন হওয়ায় এবং মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক সংসদ সদস্য জনপ্রিয় নেতা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের সমর্থন পাওয়ায় অনেকটায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও এ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ জাকির সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ভোটের মাঠে সক্রিয় অবস্থানে রয়েছেন। এছাড়াও জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মতো পূর্ব অভিজ্ঞতাও তার ঝুলিতে রয়েছে। আওয়ামী লীগের সময় তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।

অন্যদিকে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং বক্তা মাওলানা আমির হামজা বয়সে তরুণ এবং এই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। বিভিন্ন সময় ওয়াজ মাহফিলে বেফাঁস মন্তব্যের কারণে তাকে ঘিরে নির্বাচনি এলাকা ছাড়াও সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

নির্বাচনি ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অতীতে জামায়াত এ আসনে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। এবার জামায়াতের ভোট কিছুটা বাড়লেও শেষ পর্যন্ত জয় ঘরে তুলতে পারবে কি-না এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আর জামায়াত জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বের হয়ে যাওয়ায় ভোট আরও কমবে বলেও ধারণা ভোটারদের।

দলীয় কর্মী সমর্থকদের বাইরে ভাসমান ভোটাররা জয়-পরাজয়ে আরও ব্যবধান বাড়াবে বলে মনে করছেন সচেতন ভোটাররা। আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পাবেন বলে মনে করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে জামায়াতও এ আসনে জয় ঘরে তুলতে মরিয়া।

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৬ জন। আর নারী ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ১৩৩ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন। সদর আসনের ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১৪২টি ভোট কেন্দ্রের ৮৮৭টি ভোট কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এখানে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৬৩টি।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।