মেয়র থেকে এমপি-মন্ত্রী, আজও মিনুর সঙ্গী রিকশা
১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয় রাজশাহী জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে। রাজশাহী-২ (সদর) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু। পরদিন সকালে নতুন সংসদ সদস্যের প্রতিক্রিয়া নেওয়ার জন্য এ প্রতিবেদক হাজির হন মিনুর বাড়ির সামনে পদ্মা আবাসিক এলাকায়। জানা যায়, তিনি সকালেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। সেখান থেকে একটু সামনে এগোতেই দেখা মিললো তার। রিকশায় চড়ে বাড়ির জন্য কাঁচাবাজার নিয়ে ফিরছেন তিনি।
নবনির্বাচিত এমপি বললেন, এ শহরের সন্তান আমি। এ শহরের সব মানুষ আমাকে ভালোবাসে। আমি সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকি, আর শহরে রিকশায় এভাবেই চলি বহু বছর ধরে। গত ১৭ বছরের বিশৃঙ্খলার মাঝেও আমি এভাবেই চলেছি। এ শহরের মানুষ আমাকে এমপি বা মেয়র হিসেবে বিবেচনা করে না। কেউ আমাকে ভাই মনে করে, কেউ চাচা ভাবে। এটাই ভালোবাসা। এ সম্পর্কটাই আমার বড় শক্তি।
তিন দফায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মিজানুর রহমান মিনু আবারো সংসদ সদস্য হয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও রাজশাহীর অভিভাবকের ভূমিকায় তারা মিনুকে দেখতে পাবেন বলে জানান এ জনপ্রতিনিধি।
এবার সেই কথার সঙ্গে কাজ মিলে গেরো মিনুর মন্ত্রী হওয়ার পর। ভূমিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিন দিনের সরকারি সফরে রাজশাহীতে এসেছিলেন রাজশাহী–২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান (মিনু)। মিন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো নিজ নির্বাচনি এলাকায় সফরের সময় সরকারি প্রটোকল ফেলে আগের মতো রিকশা নিয়ে শহরে ঘুরেছেন তিনি। চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন, যা নিয়ে রাজশাহীর অনেক মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
রিকশাচালক আব্দুল কুদ্দুস গত ১০ বছর ধরে তার রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, স্যার আগে যেভাবে আমার রিকশায় চড়ে চলাফেরা করতেন, ভূমিমন্ত্রী হওয়ার পরও কোনো প্রটোকল ছাড়াই রিকশায় চলাফেরা করছেন। এটা দেখে আমাদেরও ভালো লাগছে।
এদিকে প্রায় তিন দশক ধরে রাজশাহী বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে মিজানুর রহমান মিনুকে ঘিরে। ১৯৯১ সালে প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিজের অবস্থান জানান দেন। এরপর আরও দু’বার মেয়র নির্বাচিত হন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ব্যাপক আলোচিত মিজানুর রহমান মিনু। তার প্রশাসনিক দক্ষতায় শহরের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। শহরের রাস্তাঘাট আর অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দর শহর গড়ার কারিগর হিসেবে অনেকেই তাকে এগিয়ে রাখেন। সেখান থেকেই মিনুর জনপ্রিয়তার সূচনা। এভাবে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি টানা প্রায় ১৭ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অন্যদিকে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র থাকাকালেই ২০০৭ সালের জুন মাসে তিনি গ্রেফতার হন। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে বিএনপি ছাড়ার একাধিক প্রস্তাব দিলেও মিনু তাতে সাড়া দেননি। তিনি সরাসরি ঘোষণা দেন, ম্যাডামের (বেগম খালেদা জিয়া) নির্দেশনার বাইরে তিনি এক চুলও নড়বেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ওই সময় একাধিক মামলা দিয়ে কারাগারে রাখা হয়।
রাজশাহী শহরের পাশাপাশি আশপাশের বিএনপির রাজনীতিতেও মিনুর অভিভাবকত্ব প্রায় আড়াই দশকের। যুবদল নেতা থাকাকালে মেয়র এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘ সময় রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালনের পর সবশেষ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ পান মিনু। বিগত বছরগুলোতে রাজশাহীতে বিএনপির যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই তার হাত ধরে উঠে আসায় অভিভাবকের ভূমিকা রেখে আসছেন তিনি।
এবারের নির্বাচনের আগে বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকাও ছিল খুবই ছোট। এর কারণও মিনুর অভিভাবকত্ব। সিটি করপোরেশনে দীর্ঘ সময় মেয়র থাকায় এবং একেবারে সাদামাটাভাবে চলাচল করায় আমজনতার কাছে মিনুর ব্যাপকতা বেড়ে যায়। এছাড়া বিএনপির একাধিক পক্ষের বিরোধের সময়ে সমঝোতা করে দেওয়ার দায়িত্বটাও এসে বর্তায় তার ঘাড়ে। এ কারণে এবারের নির্বাচনে মিনুকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পর সব পক্ষই স্বাগত জানিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ, ভাঙচুর কিংবা অবরোধের ঘটনা ঘটলেও রাজশাহী সদর আসনে তার কোনোটাই হয়নি। বরং মনোনয়ন ঘোষণার পর নেতারা ফুল নিয়ে দেখা করেছেন মিনুর সঙ্গে। রাজশাহীতে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও সব থেকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তাকেই গণ্য করা হয়। তার মনোনয়ন ঘোষণার পর রাজশাহীর নেতাকর্মীরা মিনুর পক্ষে একাট্টা হয়ে যান। এর আগে দলের মধ্যে যে বিভক্তি ছিল মিনু মনোনয়ন পাওয়ায় সবাইকে এক কাতারে আনতে সক্ষম হন তিনি। এর ফলে রাজশাহী বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে ধানের শীষের বিজয় হয়েছে খুব সহজেই। এবারের নির্বাচনে এই আসনে মিজানুর রহমান মিনু ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭০ ভোট।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, এ সময় সব থেকে প্রবীণ এই নেতার নেতৃত্বেই রাজশাহী অঞ্চলের আগামীর রাজনীতি আবর্তিত হবে।
রাজশাহী জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সমাপ্ত বলেন, এ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাণপুরুষ মিজানুর রহমান মিনু। তিনি শুধু দলের নেতাকর্মীদের কাছেই নন, রাজশাহীর সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। আগামীর রাজনীতিতে তিনিই অভিভাবক হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবেন। সেইসঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নেও তার ভূমিকা রাখার যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।
এফএ/জেআইএম