ব্যবসায়ীর কাছে লাখ টাকার ‘ল্যাপটপ আবদার’ করে প্রত্যাহার ওসি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০২:০৪ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২৬

কুষ্টিয়ার খোকসার এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতার কাছে মেয়ের জন্য এক লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ চেয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়া ওসি মোতালেব হোসেনকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পিপিএম (বার) সোমবার (২ মার্চ) রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রোববার দিনগত রাতে ওসি মোতালেব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরপরই তিনি পরিদর্শককে (তদন্ত) মশারফ হোসেনের কাছে দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বর্ষণের অভিযোগের সূত্র ধরে তাকে রোববার দুপুরে তদন্তের জন্য পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে তথ্য প্রমাণ নেওয়া হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১১টার দিকে অভিযুক্ত ওসি মোতালেব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই রাতেই তিনি কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনে যোগদান করেছেন বলে থানা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়।

ব্যবসায়ী বর্ষণ জানান, তিনি নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষায় সহায়তার জন্য আবেদন করে এখনো (সোমবার) পুলিশ, সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক নেতাদের চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। ওসি মোতালেব ক্লোজ হওয়ার খবর তিনি পেয়েছেন। এরপর থেকে ওসির ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসীরা ও ক্ষমতাসীন দলের এক সাবেক নেতা তাকে মুঠোফোনে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। রাজনৈতিক দলের নেতা তাকে (বর্ষণকে) ওসির পা ধরে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, সোমবার বেলা ১১টার দিকে জেলা পুলিশের একজন পদস্ত কর্মকর্তা ফোনে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে মামলা করতে রাজি হননি।

তিনি জানান, গত মাসের ২৪ তারিখে ফেসবুক থেকে স্ট্যাটাস সরিয়ে ফেলার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না।

গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার নাসির উদ্দিনের কাছে লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ দাবি করেন ওসি মোতালেব হোসেন। সেটি এনে দেওয়ার দায়িত্ব দেন মাহফুজুর রহমান বর্ষণ নামের এক ব্যবসায়ীকে। তবে ৩০ হাজার টাকা দামের একটি ল্যাপটপ দেওয়া হলে সেটি ফেরত দেন ওসি। এখন লাগাতার হুমকিতে বিপর্যস্ত ওই ব্যবসায়ী।

এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিচার চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী বর্ষণ। পরে তা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হয়। দেওয়া হয় হত্যার হুমকি। দুই মাস ধরে চলমান এসব ঘটনায় গত শুক্রবার জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর বিচার চেয়ে ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী লিখিত অভিযোগ করেন।

খোকসা থানার ওসি মোতালেব হোসেনের বিরুদ্ধে এ চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। তার সঙ্গে একসময় সখ্যতা ছিল ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান বর্ষণের। তিনি উপজেলা সদরের বাজারের বর্ষণ ইলেকট্রিকের মালিক। তার বাবা গোলাম ছরোয়ার একই বাজারের হার্ডওয়ার পণ্যের ব্যবসায়ী। তারা বলছেন, ওসির পক্ষ নিয়ে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান হুমকি দিয়ে গেছেন। ফোনে ব্যবসায়ীকে হত্যারও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ী বর্ষণের অভিযোগ, গত ডিসেম্বরের শেষদিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা নাসির উদ্দিনের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ফোনের মালিকের সন্ধান করার জন্য বর্ষণকে ওসির কাছে পাঠান নাসির। এখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এরপর ওসি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি মেম্বার নাসির উদ্দিনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ এনে দেওয়ার দায়িত্ব দেন বর্ষণকে। বর্ষণ জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকা থেকে একটি ল্যাপটপ এনে ওসিকে দেন। কিন্তু ৩০ হাজার টাকা দামের ওই ল্যাপটপ ফেরত দেন ওসি। এরপর বর্ষণ ওসির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে শুরু হয় হুমকি-ধমকি। ওসির পক্ষে রাজন নামের এক সন্ত্রাসী এ হুমকি দিতে থাকেন।

বর্ষণ আরও জানান, গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় ওসি তার দোকানে গিয়ে ল্যাপটপ অথবা সমপরিমাণ টাকা পৌঁছে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজন বর্ষণের বাড়ি গিয়ে ওসিকে ল্যাপটপ পৌঁছে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসেন।

এ ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে বর্ষণ ২২ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে ওসির বিচার দাবিতে স্ট্যাটাস দেন। এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওসি। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজন ওই ব্যবসায়ী ও তার বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসেন। এক পর্যায়ে বর্ষণ ওই স্ট্যাটাস ফেসবুক থেকে সরিয়ে ফেলেন।

এরপর গত শুক্রবার রাতে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ওই ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসক ও কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার বরাবর একটি আবেদন করেন। এতে তার ওপর ওসি ও সন্ত্রাসী বাহিনীর জুলুমের ঘটনা তুলে ধরেন।

এ প্রসঙ্গে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাসির উদ্দিন বলেন, তার কাছে অপরিচিত ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই ফোনদাতার পরিচয় নিশ্চিত হতে তিনি ব্যবসায়ী বর্ষণের মাধ্যমে ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ওসি উল্টো তার (মেম্বারকে) বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ তোলেন।

তিনি আরও জানান, বর্ষণের কাছে ওসি ল্যাপটপ চেয়েছিলেন। সে অনুয়ায়ী ৩০ হাজার টাকা দামের একটি ল্যাপটপ কিনে থানায় পাঠান। কিন্তু সেটি ওসির পছন্দ না হওয়ায় ফেরত দিয়ে ঝামেলা শুরু করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ওসি মোতালেব হোসেন জানান, তার সঙ্গে ওই মেম্বারের দেখা হয়নি। কথা হয়নি। তিনি চাঁদা চাইলেন কী করে? আর বর্ষণ সম্পর্কে বলেন, ওই দোকানে মালপত্র কেনার জন্য দুই একবার সেখানে গেছেন।

আল-মামুন সাগর/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।