রাজশাহী বিভাগে অস্তিত্ব সংকটে ছোট রাজনৈতিক দলগুলো

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৮:৫৮ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২৬

রাজশাহী বিভাগে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা খুবই সামান্য ভোট পেয়েছেন। এখানে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৭ টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২১টি দলের ভোটের সংখ্যা ৮ হাজারের নিচে। বিএনপি বা জামায়াত জোটের বাইরের দলগুলো কেউই জামায়ানত রক্ষা করতে পারেনি।

রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২১৫জন প্রার্থী। ২৭টি রাজনৈতিক দলের মোট প্রার্থী ছিলেন ১৯১ জন। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন ২৪ জন। ভোটের লড়াইয়ে ২৮টি আসনে বিএনপি এবং ১১টি আসনে জামায়াতের প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

রাজশাহী বিভাগের ফলাফলে দেখা গেছে প্রথম অবস্থানে আছেন বিএনপি। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জামায়াত, তৃতীয় অবস্থানে এনসিপি, চতুর্থ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, পঞ্চম অবস্থানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং ষষ্ঠ অবস্থানে আছে জাতীয় পাটির ভোটের সংখ্যা। বিএনপির ৩৯ প্রার্থী মোট ভোট পেয়েছেন ৬০ লাখ ৯২ হাজার ৩১৪। জামায়াতের ৩৬জন প্রার্থী পেয়েছেন ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ৩১২ ভোট। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজশাহী বিভাগের ২টি আসনে তাদের প্রার্থী দিয়েছিলো। ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে এই দুই আসনে জামায়াত কোন প্রার্থী দেয়নি। আসন দুটিতে এনসিপি ভোট পেয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৯১টি ভোট। এরমধ্যে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপি প্রার্থী এসএম সাইফ মোস্তাফিজ ১লাখ ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও নাটোর-৩ আসনে এনসিপি প্রার্থী এস এম জার্জিস কাদির হারিয়েছেন জামানত। জামায়াতের স্মর্থন পেয়েও তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ২০ হাজার ৭০৭ ভোট। জামায়াত জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রাজশাহী বিভাগের একটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিলো। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহা: আব্দুর রউফ সরকার ১ লাখ ১৬ হাজার ৮০২ ভোট পেয়েছেন। এই বিভাগে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে সবথেকে বেশি একক প্রার্থী দিয়েছিলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারা ৩১ টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছেন মোট ৯৫ হাজার ৯২৮ ভোট। এবারের নির্বাচনে এ অঞ্চলে তেমন ফলাফল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় পার্টি। তারা রাজশাহী বিভাগে ২৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৫১৫। তাদের সবগুলো আসনের প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।

অন্যান্য দলগুলোর মোট ভোটের সংখ্যা ৮ হাজারের নিচে। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা ভোট পেয়েছেন ৬১৭। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৭ হাজার ১৬২। এবি পার্টি ৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৬ হাজার ৯৯৩, বাংলাদেশ কংগ্রেস একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৫৭৯, গণফোরানের তিনজন প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৮০৪। নাগরিক ঐক্য ৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৪ হাজার ৪৮১, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ৩টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১ হাজার ৮০৩, বাংলাদেশে মুসলিম লীগ একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৫৩৬ ভোট পেয়েছে । বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১ হাজার ৫৭৯, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৫৫৭, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৭ হাজার ৭১৩টি, গণ অধিকার পরিষদের ৮ প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ১৪৮। বাংলাদেশ ন্যাশলান ফ্রন্ট একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ১৯৫। বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে পেয়েছেন ৫৫১ ভোট। লেবার পার্টি একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ৩৮৭, আম জনতার দল দুটি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ৯৪৮ ভোট, বাংলাদশে সুপ্রিম পার্টি দুটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২ হাজার ৩৫৮, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে ২৯৬ ভোট, গণ সংহতি আন্দোলন ২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৭৪৫ ভোট এবং জনতার দল একটি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ১৮১ ভোট।

এরই মধ্যে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নতুন করে দল গুছানোর কাজও শুরু করেছে কোনো কোনো দল। আবার ভোটের সংখ্যা কম হলেও কোনো কেকোন দল মনে করেন তারা পর্যাপ্ত ভোটই পেয়েছে।

এবিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজশাহী জেলা সভাপতি মুফতি মুরশিদ আলম ফারুকী বলেন, আসলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আমরা যেটা ভাবি আমাদের দল আসলে ছোট দল না। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন দলে থেকে ইসলামী আন্দোলন খুব একটা পিছিয়ে নাই কারণ ইসলামী আন্দোলন এককভাবে ২৫৭ আসনে প্রার্থী দিয়েছে এটা চারটাখানি ব্যাপার নয়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের কর্মী কম নয়। আমাদের কর্মী ভালো আছে। জনগণ সমর্থনও করছে, জনগণ ভালোবাসে এবং ইসলামী আন্দোলনকে একভাবে ভালোবাসে আশা করি যে আগামীতে আরও জনগণ হাত পাখায় ভোট দিবে এবং হাতপাখার কর্মীরা ধীরে ধীরে ডেভেলপ হবে। আমরা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি এবং ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন টু ইউনিয়ন আমরা কর্মীদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে দল কিভাবে গোছানো যায় সেই চেষ্টা আমরা করতেছি। আশা করি যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পিছিয়ে নাই, সামনেও পিছে থাকবে না।

নাগরিক ঐক্য রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক ডা. সামছুল আলম বলেন, আমরা যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল আছি এসব যারা নেতৃত্বে আছেন ইনারা তৃণমূল লেভেলের কোন নজর দেয়নি। সেই মত ভোটের যে একটা স্ট্যান্ডার্ড মাপকাটি থাকে সেখানে দায়িত্ব ছোট ছোট পার্টির ইনারা ব্যর্থ হয়েছেন। প্রার্থীদের পরিচিতি দিতে তৃণমূল লেভেলে যে আমাদের পরিচিতিটা এটা উনারা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় দুইটা ব্র্যান্ডই আছে পরিচিতি আছে। আমাদের নেতৃত্বরা যারা আছেন উনারা সেন্ট্রাল থেকে কোন পার্টির পরিচিত করাইতে পারেন। আমরা জনগণের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। এসব কারণে আমরা অত্যন্ত কম ভোট পেয়েছি।

এনসিপি রাজশাহী মহানগরের সাবেক আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বলেন, জনগণ তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন অনুযায়ী বড় দলকে পাওয়ারে দেখতে চাইছে। যারাই যে পক্ষে গেছে তারা তাদের দলকে পাওয়ার দেখতে চাইছে। এই কারণে যারা আসলে ক্ষমতায় আসতে পারবে না তাদেরকে জনগণ এবার আসলে কোনোভাবেই গুরুত্ব দেয়নি। মূলত জনগণ চাইছে যে কারা পাওয়ার পলিটিক্সে যেতে পারবে। ইন্ডিভিজুয়াল যারা এখানে নির্বাচনে আসছে তারা আসলে ভালো করতে পারেনি। জনগণ ক্ষমতাকেন্দ্রিকই চিন্তা করেছে। কারণ জনগণ যে ভোটটা দিবে সেই ভোটটা তো আসলে কাজে লাগতে হবে। জনগণ তার ভোটকে কাজে লাগাতে গিয়ে অন্যান্য ছোট দলগুলোর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ছোট দলগুলোর যে রাজনীতি সে রাজনীতিগুলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয়নি বলেই আমার কাছে মনে হয়। এই পটপরিবর্তনের মধ্যে আমার কাছে যেটা মনে হয় যে, অনেকগুলো ছোট ছোট দল ইতিপূর্বে যে রাজনীতিগুলো বাংলাদেশে করছে যে ধাঁচের রাজনীতি করছে জনগণ সেই ধরনের ওই সমস্ত দলের রাজনৈতিক এজেন্ডার উপরে আসলে আস্থা রাখতে পারেনি। যার কারণে তাদের এরকম ফলাফল বিপর্যয়। আর আমরা যেহেতু ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে নির্বাচন করছি এই জোটে আমাদের যে ফলাফল এটা সম্মিলিত ফলাফল। এককভাবে নির্বাচন করলে তখন আমরা বুঝতে পারবো আমাদের আসলে ফলাফলটা কী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারা ছোট দলগুলোর ফল বিপর্যয়ের একটি কারণ। এছাড়া এবারের নির্বাচনে ক্ষমতায় কারা আসতে পারে এমন ভাবনা মাথায় রেখে অনেকেই ভোট দেওয়ার কারণে বিএনপি এবং জামায়াতের ভোটের পাল্লা ভারি হয়েছে। জনমানুষের কল্যাণে কাজ না করলে কোনো রাজনৈতিক দলের টিকে থাকা মুশকিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাসুদুল হাসান খান মুক্তা বলেন, যদি দেশের কল্যাণে দেশের জন্য মানুষের কল্যাণে কাজ না করে কেউ বা কোন দল বা গোষ্ঠী যদি নিজেদের কল্যাণে কাজ করার চিন্তা করেন তাহলে তারা এরকমভাবে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবেন। এই যে বিগত ১৫ বছরের যে অনাচার থেকে আমাদের একটা শিক্ষা রয়েছে। আজকে যেমন আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ দল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এবং বিলীন হওয়ার পথে। আপনি দেখবেন যে এখন স্লোগান দেওয়ার লোক নেই। দিলেও কিন্তু জনগণই তাদেরকে পিটিয়ে মাঠ ছাড়া করে দিচ্ছে। এটা তো হওয়া উচিত ছিল না। কারণ একটা পুরোনো দল যারা এই দেশে রাজনীতি করবে এটাই আমরা চেয়েছি। কিন্তু রাজনৈতিক দল যত পুরোনো হোক তার কর্মকাণ্ড যদি ভালো না হয়, সেটা যদি দেশের স্বার্থে না হয় দেশের মানুষের স্বার্থে না হয় সেটা যত বড় দলই হোক আর যত ছোট দলই হোক তাদের অস্তিত্ব সংকট হবে। একসময় হয়তো তারা বিলীন হয়ে যাবে। মূল কথা হলো এই দেশে যদি কেউ রাজনীতি করতে চান তাহলে তাদেরকে এই দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করতে হবে।

সাখাওয়াত হোসেন/এনএইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।