তিনদিনে ৩ দুর্ঘটনা

শতবর্ষী সিলেট-আখাউড়া রেলপথে দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৪:০৩ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
পুরোনো ইঞ্জিন ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে নিয়মিত ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে এ রুটে

এক মাসে ৫০ ট্রেন বিলম্ব
পুরোনো ইঞ্জিন ও দুর্বল লাইনে বিপর্যস্ত রেল যোগাযোগ
ইঞ্জিন সংকট ও অবকাঠামো দুর্বলতায় ভোগান্তিতে পর্যটকরা

ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট-আখাউড়া রেলপথ স্থাপন করা হয় পণ্য সরবরাহের জন্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের পাশাপাশি এই রেলপথে যাত্রী চলাচল শুরু হয়। ট্রেনযাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক হওয়ায় যাত্রী সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পায়। তবে শত বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোনো এই রেলপথের আর উন্নয়ন হয়নি। সিলেট অঞ্চলের মানুষের জন্য এই পথ এখন শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয় মহা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত একমাসে এই রুটে পুরোপুরি ইঞ্জিন বিকলসহ আংশিক বিকল হয়ে বিলম্ব করে গন্তব্যে পৌঁছেছে অন্তত ৫০টি ট্রেন। সবশেষে টানা তিন দিনে বড় ধরনের তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ইঞ্জিন বিকল ও সংকটের কারণে প্রতিদিন একাধিক ট্রেন বিলম্ব করে ছেড়ে আসে। আর এতে করে চরমভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই অঞ্চলের ট্রেন যাত্রীদের। পর্যটন এলাকা হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকরাও।

সিলেট রুটে গত সপ্তাহে ট্রেনের আলোচিত ৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলায় সিলেটগামী তেলবাহী ট্রেনের ৫টি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে ১৪ ঘণ্টার বেশি সময় রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এর আগে বুধবার (১ এপ্রিল) কুমিল্লায় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের তিনটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এসময় বগি তিনটি লাইনের ওপর রেখে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে চলে যায় ট্রেনটি। তারও আগে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) মৌলভীবাজারের ভানুগাছ-শমশেরনগর এলাকায় উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কারণে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হয়। এছাড়া গত ২৬ মার্চ ভৈরব বাজার জংশনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।

‘শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আমার ফ্লাইট ছিল রাত ১টায়। শমশেরনগর রেলস্টেশন থেকে জয়ন্তিকা ট্রেনে যাওয়ার কথা ছিল। দুপুর দেড়টার আসার কথা থাকলেও বিকেল ৪টায় এসেছে। পরে আমি গাড়ি রিজার্ভ করে ঢাকায় গিয়েছি। ’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসন আমলে আসাম ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে ১৮৯৮ সালে সিলেট, কুলাউড়া ও আখাউড়া হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। তবে পরে আর এ রেলপথের উন্নয়ন হয়নি। পুরোনো ইঞ্জিন ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে নিয়মিত ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে এ রুটে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় রাতে আপ ওঠার সময় বেশিরভাগ ট্রেন আটকা পড়ে। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলে। এর মধ্যে চারটি ট্রেন সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রামে চলাচল করে। এই ছয়টি ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এরসঙ্গে রয়েছে মৌলভীবাজার ও সিলেট আসা পর্যটক। সবমিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী ভোগান্তি নিয়েই এই রুটে চলাচল করছে।

শতবর্ষী সিলেট-আখাউড়া রেলপথে দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৬১০, ২৯০২ সহ বেশ কিছু নম্বরের পুরোনো ইঞ্জিন সিলেট রুটে দেওয়া হয়েছে। এই ইঞ্জিনগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ওঠার সময় বিকল হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন ট্রেনে ভালো ইঞ্জিন যখন দেওয়া হয় তখন সহজেই পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করতে পারে। পুরোনো ইঞ্জিন নিয়ে প্রায় প্রতিদিন ট্রেনের শিডিউল বিলম্বিত হয়। কারণ যে ইঞ্জিন ঢাকা থেকে সিলেট আসে, একই ট্রেন একই ইঞ্জিন নিয়ে আবার ফিরতে হয়।

এছাড়া সিলেট-আখাউড়া রেলপথে অন্তত দশটি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব সেতুতে রেলের গতি কমিয়ে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেললাইন থেকে নিয়মিত নাট, বল্টু ও ক্লিপ চুরি হচ্ছে। রেললাইনে পর্যাপ্ত নাট-বল্টু ও ক্লিপার না থাকায় তীব্র গরমে লাইন বাঁকা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টুকটাক লাইন মেরামত করা হলেও নতুন রেললাইন বা বড় ধরনের মেরামতের উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা। পুরোনো রেললাইন থাকায় কোনো কারণ ছাড়াই ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

রেলওয়ে বলছে, দেশে চাহিদার তুলনায় ৭০ শতাংশ ট্রেনের ইঞ্জিন আছে। এজন্য পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে চলতে হচ্ছে। প্রয়োজনে ইঞ্জিন মেরামত করা হয়। এছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। অবকাঠামো যেখানে প্রয়োজন সেখানে মেরামত করা হয়। এই অঞ্চলে রেলের অবকাঠামো যে পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ সেটা বলা যাচ্ছে না। আবার পুরো খারাপ সেটাও বলা যাচ্ছে না।

‘ট্রেনের ইঞ্জিনের সমস্যা আছে ঠিক, তবে ঈদের পর থেকে বেশি সমস্যা হচ্ছে। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি কী কারণে এই সমস্যাটা বেড়ে গেছে। হবিগঞ্জের তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

এই অঞ্চলের সাধারণ ট্রেনযাত্রী ও পর্যটকদের দাবি, দ্রুত সিলেট-আখাউড়া রেলপথ দুই লাইনে করা হোক। একইসঙ্গে পুরোনো ও দুর্বল ইঞ্জিন পরিবর্তন করে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করা হোক। যাতে সাধারণ যাত্রীরা নিরাপদে ট্রেনে যাতায়াত করতে পারেন।

শওকত আহমেদ নামে এক প্রবাসী বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আমার ফ্লাইট ছিল রাত ১টায়। শমশেরনগর রেলস্টেশন থেকে জয়ন্তিকা ট্রেনে যাওয়ার কথা ছিল। দুপুর দেড়টার আসার কথা থাকলেও বিকেল ৪টায় এসেছে। পরে আমি গাড়ি রিজার্ভ করে ঢাকায় গিয়েছি।

শতবর্ষী সিলেট-আখাউড়া রেলপথে দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী

ঢাকা থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসের যাত্রী আমির উদ্দিন ট্রেনের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে জানান, সোমবার রাতে ঢাকা থেকে রাত ১০টায় ছাড়ার কথা থাকলেও রাত ১২টায় ছেড়ে আসে ট্রেনটি। সকাল ৬টায় শমশেরনগর ভানুগাছ রেলস্টেশনের আগে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ভোর ৫টায় সিলেট পৌঁছানোর কথা থাকলেও দুপুর ১২টায় এসেছি। সিলেটের ট্রেন যাত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত এমন ঘটনা ঘটছে। রেলপথ যেন এখন কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘আমাদের সারা দেশে ৮৫টি রেলের ইঞ্জিন প্রয়োজন। তবে আমাদের আছে ৭০ শতাংশ। এজন্য আমাদের কিছু সমস্যা হচ্ছে। এজন্য অনেক ট্রেনের বিলম্ব হয়। এই জায়গায় কিছু সমস্যা আছে। নতুন করে এডিপির একটি প্রকল্প শুরু করেছি। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এর সমাধান হবে।’

তবে ঘন ঘন রেলের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, আমিও বুঝতে পারছি না হঠাৎ করে এই রুটে কেন এই সমস্যাটা বেড়ে গেলো। এর বিশেষ কোনো কারণ আছে কি না দেখতে হবে। ট্রেনের ইঞ্জিনের সমস্যা আছে ঠিক, তবে ঈদের পর থেকে বেশি সমস্যা হচ্ছে। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি কী কারণে এই সমস্যাটা বেড়ে গেছে। হবিগঞ্জের তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, আমাদের সারা দেশে ৮৫টি রেলের ইঞ্জিন প্রয়োজন। তবে আমাদের আছে ৭০ শতাংশ। এজন্য আমাদের কিছু সমস্যা হচ্ছে। এজন্য অনেক ট্রেনের বিলম্ব হয়। এই জায়গায় কিছু সমস্যা আছে। নতুন করে এডিপির একটি প্রকল্প শুরু করেছি। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এর সমাধান হবে। এই সময়ের জন্য সরকার একটা উদ্যোগ নিয়েছে। ইঞ্জিনগুলো ভালো ভাবে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামোর বিষয়ে তিনি বলেন, রেললাইনের অবস্থা অনুযায়ী মেরামত করা হয়। অবকাঠামো একেবারে ভালো বলবো না, তবে একেবারে খারাপও না। লাইনের অবস্থা অনুযায়ী রেলের গতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। অবকাঠামোর জন্য আমাদের পূর্বাঞ্চলের রেললাইন পুনর্বাসনে একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন আছে। এটা অনুমোদন হলে বিভিন্ন কাজ করা যাবে।

এম ইসলাম/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।