স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় ঘুম আসে না
আজ ভয়াবহ ২১ আগস্ট। ২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় অন্যদের সঙ্গে মাদারীপুরের ৪ নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় আরো কয়েকজন। তারা এখন পঙ্গুত্ব নিয়ে দুঃসহ জীবন-যাপন করছেন। দীর্ঘ ১২ বছর পরও সে দিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
বর্বরোচিত এ গ্রেনেড হামলায় নিহত শ্রমিক নেতা নাসিরউদ্দিন ছিল আওয়ামী লীগের অন্ধ ভক্ত। তাই আওয়ামী লীগের মিছিল, মিটিং বা সমাবেশ হলে তাকে কেউ বেধে রাখতে পারতো না। মিছিল-মিটিংয়ের আগে থাকতো, স্লোগান দিতো। শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ আর শোনা যায় না।
নাসিরের বড় ছেলে মাহাবুব হোসেন (২২) জানান, বাবার উপার্জনেই চলতো সংসার। বাবার মৃত্যুর পর টাকার অভাবে আমাদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো দিন আধপেটা আবার কোনো দিন খাবারই জোটেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন। এখন সেই টাকার লভ্যাংশ দিয়ে আমার মা, আমি আর আমার ভাই নাজমুলকে নিয়ে কোনো রকম বেঁচে আছি।
বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহত হন রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামের যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সি। লিটন মুন্সির মেয়ে মিথিলার বয়স এখন ১২। বাবার মৃত্যুর ৩ বছর পর মার বিয়ে হয়েছে অন্যত্র। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান, লিটনের মা ও মেয়ের মধ্যে ৫ লাখ করে বিতরণ করে দেয়া হয়। বাবার পক্ষ থেকে এটিই তার শেষ পাওনা।
এদিকে লিটনের ছোট বোন ইসমত আরা জানান, বাবা, মা আর আমরা দু`ভাই-বোন ছিলাম এ সংসারের সদস্য। বাবা-মার বয়স হয়ে গেছে। কোনো কাজ করার ক্ষমতা নেই। যেটুকু জমি-জিরাত আছে, তার উৎপাদিত ফসলেই আমাদের চালিয়ে নিতে হয়। এছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই আমাদের।
তিনি আরো বলেন, ২০১৩ সালে যখন চেক গ্রহণ করেন আমার মা, তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আপনার সন্তান গেছে, দুঃখ করবেন না। আমরা আছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে মা কয়েকবার ঢাকা গেছেন, কিন্তু তিনি দেখা করতে পারেননি। তাকে দেখা করতে দেয়া হয়নি।
গ্রেনেড হামালায় নিহত অপর যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহম্মেদ ওরফে কালা সেন্টু। তার বাড়ি কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর। সে বরিশালের মুলাদি নানা বাড়িতে বড় হয়েছে। এ কারণেই তার লাশ মুলাদিতেই দাফন করা হয়।
কথা হয় সেন্টুর স্ত্রী আইরিন সুলতানার সঙ্গে। তিনি এখন মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ঢাকা শাখায় চাকরি করেন। এক মেয়ে আফসানা আহমেদ রীদিকে (১২) নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তিনি বলেন, এমন দুঃসহ স্মৃতি কি ভোলা যায়, না মুছে ফেলা যায়। মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় থাকি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান পেয়েছিলাম। সে সম্বল আর চাকরি থেকে যা পাই, তা দিয়েই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবছি।
গ্রেনেড হামলায় অন্যদের মধ্যে নিহত সুফিয়া বেগমের বাড়ি রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের মহিষমারি গ্রামে। ওই দিন মনারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রথম সারিতেই ছিলেন সুফিয়া বেগম। চঞ্চলা ও উদ্যমী এই সুফিয়া সপরিবারে ঢাকায় থাকতেন। মারা যাওয়ার পর তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঢাকা থাকার কারণে সুফিয়ার লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালকিনি পৌরসভার বিভাগদি গ্রামের মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের ছেলে হালান হাওলাদারের একটি পা গ্রেনেড হামলায় নষ্ট হয়ে গেছে। আজীবন পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাকে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছিলেন হালান। এখন সে ঢাকা ঘুরে ঘুরে মুরগির ব্যবসা করে।
হালানের সঙ্গে কথা হলে সে বলে, খোড়া পা নিয়ে কষ্ট হয় ঘুরে ঘুরে মুরগি বিক্রি করতে। তাছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে প্রচুর স্প্লিন্টার। জ্বালা-যন্ত্রণায় অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। সে কারণে তেমন আয়ও করতে পারি না।
কালকিনি পৌর এলাকার চরঝাউতলা গ্রামের সাইদুল ২১ আগস্ট ঢাকা পল্টন ময়দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেট হামলার শিকার হয়ে চোখের দৃষ্টি হারিয়ে অন্ধত্ব নিয়ে জীবনযাপন করছেন। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকার অনুদান পেয়েছিল সে।
প্রধানমন্ত্রীর অনুদান পেয়ে সে ডিশ ব্যবসা করতে নামে, কিন্তু এলাকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে সে ব্যবসাতে লোকসান হয়। এ নিয়ে ইউএনও থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারস্থ হলেও সাইদুলের কথা কেউ কানে নেয় নি। ২০১৩ সালে জীবনকে পরিবর্তন করার জন্য বাড়ির জমি বিক্রি করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে ওমান গিয়েছিল। পরিশ্রমের কাজ করতে না পারায় ৮ মাস পর তাকে ফিরে আসতে হয় বাংলাদেশে।
তিনি জানায়, ৮ মাসে সে ৫০ হাজার টাকাও উপার্জন করতে পারেনি। চোখ হারিয়ে এখন সে প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডের জন্য সাইদুল এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।
কৃষ্ণনগর গ্রামের কবির হোসেনের ডান হাত স্প্লিন্টারের আঘাতে বাঁকা হয়ে গেছে। এখন সে উপজেলার পাশে কাঁচা তরকারির ব্যবসা করে। বাবা, মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬। উপার্জন করে শুধু কবির। অনেকেই অনেক টাকা পেলেও কবির পেয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। শরীরে এখনো স্প্লিন্টার রয়ে গেছে। যার যন্ত্রণায় ঘুম আসে না।
এসএস/পিআর